আনোয়ারা জামাল । নৃত্যশিল্পী, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অভিনেত্রী

আনোয়ারা জামাল যিনি আনোয়ারা নামেই অধিক পরিচিত, একজন বাংলাদেশী চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অভিনেত্রী এবং নৃত্যশিল্পী। তিনি মোট ৮ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেছেন।

আনোয়ারা জামাল । নৃত্যশিল্পী, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অভিনেত্রী

প্রাথমিক জীবন

আনোয়ারা জামাল ১৯৪৮ সালের ১ জুন কুমিল্লাতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা জামাল উদ্দিন ও মা ফরিদুন্নেসা। তার বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে।

 চলচ্চিত্রে আগমন

ষাটের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে আনোয়ারার আগমন ঘটে। তার চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবে। ১৯৬১ সালে ১৪-১৫ বছর বয়সে অভিনেতা আজিমের মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রে আসেন।  এসময় তিনি পরিচালক ফজলুল হকের “আজান” চলচ্চিত্রে প্রথম নৃত্যশিল্পী হিসেবে কাজ করেন।  নাচ শিখেছেন ওস্তাদ দেব কুমার এর কাছে।

চলচ্চিত্রটি মুক্তি দেওয়ার সময় এর নাম পরিবর্তন করে ‘উত্তরণ’ রাখা হয়। তবে ‘উত্তরণ’ চলচ্চিত্রটি পরে মুক্তি পায়নি। তার অভিনীত প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘নাচঘর’।  এ চলচ্চিত্রেও তিনি নৃত্যশিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা আবদুল জব্বার খান ছিলেন এ চলচ্চিত্রের পরিচালক।

উর্দু ভাষার এ চলচ্চিত্রটি ১৯৬৩ সালে মুক্তি পায়। একই বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘প্রীত না জানে রীত’ চলচ্চিত্রেও নৃত্যশিল্পী হিসেবে ছিলেন। এর পরে তিনি বেশ কিছু উর্দু ও বাংলা চলচ্চিত্রে কাজ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি জহির রায়হানের সংগম চলচ্চিত্র প্রথম সহ-অভিনেত্রী হিসেবে অভিনয় করেন।

আনোয়ারা জামাল । নৃত্যশিল্পী, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অভিনেত্রী

১৯৬৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জানাজানি’ চলচ্চিত্রটি তার জীবনে একটি উল্লেখযোগ্য ছবি। ওই ছবিতে তার নায়ক ছিলেন শওকত আকবর। ১৯৬২ – ১৯৬৬ সালে তিনি মোট ১৯টি চলচ্চিত্রে বিভিন্ন পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেন।১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত “বালা” নামের একটি চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।তার বিপরীতে ছিলেন হায়দার শফি। নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা চলচ্চিত্রটি ছিল আনোয়ারার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। এ চলচ্চিত্রে তিনি আলেয়া চরিত্রে অভিনয় করেন।

তার বিপরীতে খ্যাতিমান অভিনেতা আনোয়ার হোসেন নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা চরিত্রে অভিনয় করেন। তৎকালীন সমগ্র পাকিস্তান জুড়ে চলচ্চিত্রটি অভাবনীয় ব্যবসা সফলতা লাভ করে। ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে এ চলচ্চিত্রটি উর্দুতেও চিত্রায়িত হয়।এভাবে, চলচ্চিত্রটি লাহোর, করাচি, কোয়েটা, মুলতান, পেশোয়ারে মুক্তির পরে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানেও আনোয়ারার নামধাম ছড়িয়ে পড়ে।

এর পরে বহুবার নবাব সিরাজউদ্দৌর মঞ্চায়ন হয়েছে। আলেয়া চরিত্রে তিনি ছিলেন নির্ধারিত।আনোয়ারার চলচ্চিত্র জীবনের আরও ৩টি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হচ্ছে ১৯৭৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত গোলাপী এখন ট্রেনে, ১৯৮২ মুক্তিপ্রাপ্ত দেবদাস ও ১৯৮৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত শুভদা। গোলাপী এখন ট্রেনে চলচ্চিত্রটি ১৯৭৮ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অণুষ্ঠানে সেরা চলচ্চিত্র সহ ১০টি বিভাগে পুরস্কার লাভ করেন।

আনোয়ারা জামাল । নৃত্যশিল্পী, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অভিনেত্রী

এর মধ্যে তিনি সেরা পার্শ্বচরিত্রে অভিনেত্রী হিসেবে পুরস্কার লাভ করেন। এ চলচ্চিত্রে তিনি “ময়না বু” চরিত্রে অভিনয় করেন।  চাষী নজরুল ইসলামের দেবদাস চলচ্চিত্রে তিনি চন্দ্রাবতী চরিত্রে অভিনয় করেন। একই পরিচালকের শুভদা চলচ্চিত্রে তিনি কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন। এ চলচ্চিত্রটি ১৯৮৭ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অণুষ্ঠানে সেরা চলচ্চিত্রসহ ১১টি বিভাগে পুরস্কার লাভ করেন আনোয়ারা এ চলচ্চিত্রে “সেরা অভিনেত্রী” হিসেবে পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৭২ এর পরে তিনি ভাবী, চাচী, শাশুড়ি ও মায়ের চরিত্রেই বেশি উপস্থিত হয়েছেন। এই চরিত্রগুলোতেই তিনি বেশি সফল হয়েছেন বলে মনে করেন। ১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত নয়নমনি চলচ্চিত্রে আনোয়ারা চাচিমা চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন। অধিকাংশ চলচ্চিত্রেই তিনি অভিনয় করেছেন মায়ের ভূমিকায়। ১৯৮৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত “অন্তরে অন্তরে” চলচ্চিত্রে আনোয়ারা সর্বপ্রথম দাদীমা চরিত্রে অভিনয় করেন।

আনোয়ারা জামাল তার প্রায় পঞ্চাশ বছরের অভিনয়জীবনে সাড়ে ছয়শ’র ও অধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।  অসংখ্য মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেছেন ও বেশকিছু টেলিভিশন নাটকেও কাজ করেছেন। একবার সেরা অভিনেত্রী সহ মোট আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেছেন তিনি।

আনোয়ারা জামাল । নৃত্যশিল্পী, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অভিনেত্রী

চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে, গোলাপী এখন ট্রেনে (১৯৭৮), সুন্দরী (১৯৭৯), সখিনার যুদ্ধ (১৯৮৪), শুভদা (১৯৮৬), মরণের পরে (১৯৯০), রাধা কৃষ্ণ (১৯৯২), বাংলার বধূ (১৯৯৩) ও অন্তরে অন্তরে (১৯৯৪) ।  এছাড়াও তিনি কিউট-চ্যানেল আই চলচ্চিত্র মেলা পুরস্কার (২০১০) ও টেলিভিশন রিপোর্টার্ন এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ট্র্যাব কর্তৃক আয়োজিত “ট্র্যাব অ্যাওয়ার্ড” (২০১১) লাভ করেন। দুটিই থেকেই তাকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করে।

ব্যক্তিগত জীবন

১৯৭২ সালে মুহিতুল ইসলাম মুহিতের সাথে আনোয়ারার বিয়ে হয়।  তাদের একমাত্র সন্তানের নাম মুক্তি। তিনিও একজন অভিনেত্রী। তার একমাত্র নাতনী কারিমা ইসলাম দরদী।

আরও দেখুনঃ

মন্তব্য করুন