অভিনেত্রী শাবানা । চলচ্চিত্র অভিনেত্রী

বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের সোনালী দিনের প্রথম সারির অভিনেত্রী শাবানা। শাবানা হচ্ছেন একজন বাংলাদেশী জীবন্ত কিংবদন্তী চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। ১৯৬২ সালে শিশুশিল্পী হিসেবে নতুন সুর চলচ্চিত্রে তার চলচ্চিত্রে আবির্ভাব ঘটে। পরে ১৯৬৭ সালে চকোরী চলচ্চিত্রে চিত্রনায়ক নাদিমের বিপরীতে প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করেন। শাবানার প্রকৃত নাম রত্না। চিত্র পরিচালক এহতেশাম চকোরী চলচ্চিত্রে তার শাবানা নাম প্রদান করেন। তার পূর্ণ নাম আফরোজা সুলতানা।

অভিনেত্রী শাবানা । চলচ্চিত্র অভিনেত্রী

প্রাথমিক জীবন

অভিনেত্রী শাবানা ১৯৫৩ সালের ৫ জুন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম ফয়েজ চৌধুরী যিনি একজন টাইপিস্ট ছিলেন এবং মা ফজিলাতুন্নেসা ছিলেন গৃহিণী। শাবানার ছোট খালা ছিলেন তার প্রিয় পাত্র। তার নানার বাসা কাছেই ছিল তাদের বাসা থেকে। শাবানা গেন্ডারিয়া হাই স্কুলে ভর্তি হলেও তার পড়ালেখা ভালো লাগত না। শাবানা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার তাই ইতি ঘটে মাত্র ৯ বছর বয়সে। চলচ্চিত্রকার এহতেশাম ছিলেন তার চাচা। শাবানার বাবার খালাতো ভাই। তার মাধ্যমেই শাবানার চলচ্চিত্রে আগমন হয়।

চলচ্চিত্র জীবন

অভিনেত্রী শাবানার চলচ্চিত্র কর্মজীবনের সূচনা হয় শিশু শিল্পী হিসেবে নতুন সুর চলচ্চিত্র দিয়ে। তিনি তার ৩৬ বছর কর্মজীবনে ২৯৯টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন, যার মধ্যে ১৩০টি চলচ্চিত্রে তার বিপরীতে ছিলেন আলমগীর।। ষাট থেকে নব্বই দশকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিলেন এই অভিনেত্রী। সুনিপুণ অভিনয়ের মাধ্যমে শাবানা জয় করে নিয়েছেন কোটি দর্শকের মন। চার দশক ধরে অত্যন্ত প্রতাপের সঙ্গে অভিনয় করেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের জীবন্ত কিংবদন্তি এই অভিনেত্রী। সমাজ ও পারিবারিক জীবনের বহু সমস্যা ও টানাপড়েনের চিত্র তিনি তার অভিনয়ের মাধ্যমে তুল ধরেছেন। দর্শকদের কাঁদিয়েছেন, শিখিয়েছেন। পেয়েছেন রেকর্ড সংখ্যক ১০ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।২০০০ সালে রূপালী জগৎ থেকে নিজেকে আড়াল করে ফেলেন এ নায়িকা।

অভিনেত্রী শাবানা । চলচ্চিত্র অভিনেত্রী

১৯৬২ সালে ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন শাবানা। ওই সময় পর্দায় নাম ছিল রত্না। এরপর ‘তালাশ’-সহ বেশ কয়েকটি সিনেমায় নৃত্যশিল্পী ও অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন তিনি। সহনায়িকা চরিত্রে দেখা যায় ‘আবার বনবাসে রূপবান’ ও ‘ডাক বাবু’তে।১৯৬৭ সালে এহতেশাম পরিচালিত ‘চকোরী’তে চিত্রনায়ক নাদিমের বিপরীতে নায়িকা হয়ে অভিনয় করেন তিনি। আর তখন রত্না থেকে হয়ে যান শাবানা। বাংলা ও উর্দু ভাষায় নির্মিত ‘চকোরী’ ছবি ব্যবসা সফল হয়। এর পর থেকে শাবানাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।২০১৫ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে আজীবন সম্মাননা গ্রহণ করেন অভিনেত্রী শাবানা।

তিন দশকের ক্যারিয়ারে নাদিম, রাজ্জাক, আলমগীর, ফারুক, জসীম, সোহেল রানার সঙ্গে জুটি বেঁধে শাবানা উপহার দেন জনপ্রিয় অনেক ছবি। তার উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হচ্ছে, ‘ভাত দে’, ‘অবুঝ মন’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘দোস্ত দুশমন’, ‘সত্য মিথ্যা’, ‘রাঙা ভাবী’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘ওরা এগারো জন’, ‘বিরোধ’, ‘আনাড়ি’, ‘সমাধান’, ‘জীবনসাথী’, ‘মাটির ঘর’, ‘লুটেরা’, ‘সখি তুমি কার’, ‘কেউ কারো নয়’, ‘পালাবি কোথায়’, ‘স্বামী কেন আসামি’, ‘দুঃসাহস’, ‘পুত্রবধূ’, ‘আক্রোশ’ ও ‘চাঁপা ডাঙার বউ’।

পুরস্কারপ্রাপ্তি

অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে শাবানা দশবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে অভিনয়ের জন্য ৯ বার ও প্রযোজক হিসেবে ১ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন এবং ২০১৭ সালে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন শাবানা।

তার অন্যান্য পুরস্কারের মধ্যে আছে ১৯৯১ সালে প্রযোজক সমিতি পুরস্কার, ১৯৮২ ও ১৯৮৭ সালে বাচসাস পুরস্কার, ১৯৮৪ সালে আর্ট ফোরাম পুরস্কার, ১৯৮৮ সালে আর্ট ফোরাম পুরস্কার, ১৯৮৮ সালে নাট্যসভা পুরস্কার, ১৯৮৭ সালে কামরুল হাসান পুরস্কার, ১৯৮২ সালে নাট্য নিকেতন পুরস্কার, ১৯৮৫ সালে ললিতকলা একাডেমী পুরস্কার, ১৯৮৪ সালে সায়েন্স ক্লাব পুরস্কার, ১৯৮৯ সালে কথক একাডেমী পুরস্কার এবং ঐ বছরই জাতীয় যুব সংগঠন পুরস্কার।এছাড়াও শাবানা মস্কো চলচ্চিত্র উৎসব, রোমানিয়া চলচ্চিত্র উৎসব, কান চলচ্চিত্র উৎসবসহ আরো বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন।

অভিনেত্রী শাবানা । চলচ্চিত্র অভিনেত্রী

 

ব্যক্তিগত জীবন

অভিনেত্রী শাবানা ১৯৭৩ সালে ওয়াহিদ সাদিকের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ওয়াহিদ সাদিক একজন সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন। শাবানার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এস এস প্রডাকশন্সের দেখাশোনা করতেন সাদিক। ১৯৯৭ সালে শাবানা হঠাৎ চলচ্চিত্র-অঙ্গন থেকে বিদায় নেওয়ার ঘোষণা দেন এবং ২০০০ সালে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। শাবানা-সাদিক দম্পতির দুই মেয়ে – সুমি ও ঊর্মি এবং এক ছেলে – নাহিন।

আরও দেখুনঃ

মন্তব্য করুন