ম্যাডান থিয়েটার্স

নির্বাক যুগের শুরু থেকে সবাক যুগের প্রথম কয়েক বছর পর্যন্ত বাংলা তথা ভারতবর্ষের চলচ্চিত্র ব্যবসার নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় ছিল ম্যাডান থিয়েটার্স। জামশেদজী ফ্রেমজী ম্যাডান (১৮৫৬-১৯২৩) প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা তাদের ব্যবসা ভারতের বাইরে বার্মা এবং সিংহল পর্যন্ত প্রসারিত করেছিল।

১৯০২ সালে জামশেদর্জী তাঁর ব্যবসা কলকাতায় স্থানান্তরিত করেন। জে.এফ. ম্যাডান এ্যান্ড সন্স নামে একটি কোম্পানির অধীনে তাঁর থিয়েটার ব্যবসা, চলচ্চিত্র প্রদর্শন ব্যবসা, ওষুধপত্র ও মদের ব্যবসা পরিচালিত হত। জে. এফ ম্যাডান এ্যন্ড সন্স-এর অধীনস্থ ‘এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ কোঃ প্রথম দিকে কলকাতা ময়দানে তাঁবু খাটিয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শন ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিল। পরবর্তীকালে এলফিনস্টোন স্থায়ী চিত্রগৃহ নির্মাণ করে এবং মিনার্ভা ও স্টার থিয়েটার পরিচালনার দায়িত্বও গ্রহণ করে।

 

ম্যাডান থিয়েটার্স । বাংলা চলচ্চিত্রের অভিধান

 

ম্যাডান থিয়েটার্স

 

অবিভক্ত বাংলায় নির্মিত প্রথম কাহিনিচিত্র ‘সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র’ (১৯১৭) ছবিটি এলফিনস্টোনের প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছিল। ১৯১৯ সালে ‘জে. এফ ম্যাডান এ্যন্ড সন্স’ নাম পরিবর্তন করে ‘ম্যাডান থিয়েটার্স’ নামে একটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানি হিসাবে নথিভুক্ত হয়।

তাদের দ্বিতীয় কাহিনিচিত্র ‘বিশ্বমঙ্গল বা ভক্ত সুরদাস’ (১৯১৯) এলফিনস্টোন বায়োস্কোপের প্রযোজনায় তৈরি হলেও ম্যাডান থিয়েটার্সের পরিচালনায় নির্মিত বলে বিজ্ঞাপিত হয়েছিল। ১৯২৩ সালে জামশেদজীর মৃত্যুর পরেও চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ম্যাডানদের অগ্রগতি অক্ষুণ্ণ ছিল।

 

ম্যাডান থিয়েটার্স । বাংলা চলচ্চিত্রের অভিধান

 

১৯২৭ সালে ভারত, বার্মা ও সিংহল মিলে ১৭০টির বেশি স্থায়ী চিত্রগৃহে চিত্র প্রদর্শনের নিয়ন্ত্রণ ম্যাডানদের হাতে ছিল। এই সময়ে চলচ্চিত্র ব্যবসা প্রধানত জামশেদজীর তৃতীয় পুত্র জিজিবয় জামশেদজী ম্যাডানের দায়িত্বে পরিচালিত হত। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত প্রধানত পৌরাণিক কাহিনিভিত্তিক ছবি তৈরি হলেও এই সময়ে ম্যাডানরা গিরিশচন্দ্রের নাটকগুলির পাশাপাশি বঙ্কিমচন্দ্রের কাহিনিগুলি অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বত্বাধিকার লাভ করে।

এই সময় থেকেই ম্যাডানরা সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্রতী হয়। নির্বাক যুগে তারা ৫৮টি কাহিনিচিত্র তৈরি করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য অবিভক্ত বাংলার প্রথম সবাক ছবি অমর চৌধুরী পরিচালিত জামাইষষ্ঠী (১৯৩১) ম্যাডান থিয়েটার্সের প্রযোজনায় তৈরি হয়েছিল।

 

ম্যাডান থিয়েটার্স । বাংলা চলচ্চিত্রের অভিধান

 

নির্বাক যুগে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তাদের আধিপত্য সবাক যুগে ধরে রাখা সম্ভব হয় নি। ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে দেখাশোনার অভাব এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থায়ী চিত্রগৃহগুলিতে শব্দ যোজনার জন্য ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় নি। তাদের প্রযোজনায় নির্মিত শেষ ছবি রাধাকৃষ্ণ বা কলঙ্কভঞ্জন (১৯৩৩) শ্রীভারতলক্ষ্মী পিকচার্সের প্রতিষ্ঠাতা বাবুলাল চৌখানীর আর্থিক সহযোগিতায় তৈরি হয়েছিল।

 

চলচ্চিত্রপঞ্জি —
  • ১৯১৭ সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র
  • ১৯১৯ বিশ্বমঙ্গল,
  • ১৯২০ মহাভারত:
  • ১৯২১ বিষ্ণু অবতার, ধ্রুব চরিত্র, মা দুর্গা, নল দময়ন্তী, শিবরাত্রি
  • ১৯২২ ভগীরথ গঙ্গা, ভীষ্ম, বিষবৃক্ষ, বিয়ের বাজার, লায়লা মজনু, মোহিনী, নর্তকী তারা, রামায়ণ, রত্নাবলী;
  • ১৯২৩ মাতৃ স্নেহ, নূরজাহান
  • ১৯২৪ বসন্তপ্রভা, গোমাতা, কমলে কামিনী, নবীন ভারত, পাপের পরিণাম, পত্নী প্রতাপ, প্রেমাঞ্জলি
  • ১৯২৫ মিশর রাণী, সতীলক্ষ্মী,
  • ১৯২৬ ধর্মপত্নী, জেলের মেয়ে, জয়দেব, কৃষ্ণকান্তের উইল, প্রফুল্ল,
  • ১৯২৭ চণ্ডীদাস, দুর্গেশনন্দিনী, জনা;
  • ১৯২৮ ভ্রান্তি, সরলা, শাস্তি কি শান্তি,
  • ১৯২৯ ইন্দিরা, যুগলাঙ্গুরীয়, কপালকুণ্ডলা, রজনী,
  • ১৯৩০ ভারত রমণী, পালিয়া, গিরিবালা, কাল পরিণয় কৃষ্ণবর্ণ তীরন্দাজ, মানিকজোড়, মৃণালিনী, রাধারাণী, রাজসিংহ,
  • ১৯৩১ বিবাহ বিভ্রাট, দেবী চৌধুরানী, গুপ্তরত্ন, কেরানীর মাসকাবার, জামাইষষ্ঠী (সবাক), জোরবরাত (সবাক), প্রহ্লাদ (সবাক), ঋষির প্রেম (সবাক), তৃতীয় পক্ষ (সবাক):
  • ১৯৩২ মাধবীকঙ্কণ, নৌকাডুবি, বিষ্ণুমায়া (সবাক), চিরকুমারী (সবাক), কৃষ্ণকান্তের উইল (সবাক),
  • ১৯৩৩ জয়দেব (সবাক), রাধাকৃষ্ণ (সবাক)।

Leave a Comment