প্রণব রায়ের জন্ম কলকাতায়। শিক্ষা ব্রাহ্মা বয়েজ স্কুল, সিটি কলেজ, বি. ই. কলেজ। পরিবারে সংগীতচর্চা ছিল, অল্প বয়স থেকেই সাহিত্যে অনুরাগ তাকে পরবর্তী কালে কবি ও গীতিকার হিসাবে স্বীকৃতি এনে দিয়েছিল। কলেজে পড়ার সময় থেকেই তাঁর লেখা কবিতা, গল্প তৎকালীন সাহিত্য পত্রিকার ভারতবর্ষ, বসুমতী, কল্লোল, কবিতা ছাপা হয়েছে।

প্রণব রায়
কিছুদিন বসুমতী পত্রিকার বার্তা বিভাগে চাকরি করেছেন। পরবর্তী কালে পাইওনিয়ার রেকর্ড কোম্পানিতেও কিছুদিন কাজ করেন। বন্ধুদের সাথে নাগরিক নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন, পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কারণে তৎকালীন ইংরেজ শাসনে পত্রিকাটির প্রকাশে নিষেধ জারি হয়।
এ ছাড়াও বিশ্বত পত্রিকায় তাঁর লেখা ‘কমরেড’ কবিতার এবং স্বদেশ পত্রিকায় তাঁর লেখা একটি ছোটগল্পে ইংরেজ শাসন সম্পর্কে কিছু মন্তব্য তৎকালীন শাসকেরা মেনে নিতে পারেন নি, তাঁকে বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করা হয়।
সংগীতের জগতে তাঁর পদার্পণ গীতিকার হিসাবে। ১৯৩৪ সালে তাঁর লেখা গানে তুলসী লাহিড়ীর সুরে তৎকালীন বিখ্যাত গায়িকা / অভিনেত্রী কমলা ঝরিয়ার রেকর্ড প্রকাশিত হয়। চলচ্চিত্রে প্রথম কাজ পণ্ডিতমশাই (১৯৩৬)। ছবিটি প্রযোজনা করে পপুলার পিকচার্স এবং পরিচালনা করেছিলেন সতু সেন।

১৯৩৮ সালে তাঁর লেখা কৌতুক নকশা ‘আত্মহত্যা’ রেকর্ড কোম্পানি প্রকাশ করে। এই কৌতুক নকশায় তিনি অভিনয়ও করেছিলেন। নিউ থিয়েটার্স প্রযোজিত এবং নীতিন বসু পরিচালিত পরিচয় (১৯৪১) ছবিতে রবীন্দ্র সংগীতের পাশে তাঁর লেখা ‘যখন রব না আমি, দিন হলে অবসান/আমারে ভুলিয়া যেয়ো, মনে রেখো মোর গান’ গানটি গেয়েছিলেন কুন্দনলাল সায়গল এবং ছবিটির সংগীত পরিচালক ছিলেন রাইচাঁদ বড়াল।
এই গান তাকে খ্যাতি এনে নিয়েছিল। নীরেন লাহিড়ী পরিচালিত গরমিল (১৯৪২) ছবিতে তাঁর লেখা ‘এই কি গো শেষ দান, বিরহ দিয়ে গেলে’ এবং ‘মোর অনেক দিনের আশা আমি বলব গানে গানে’ গান দুটিও খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল।
প্রমথেশ বড়ুয়া পরিচালিত ও প্রযোজিত শেষ উত্তর (১৯৪২) ছবিতে তিনি একটিই গান লিখেছিলেন। কানন দেবীর কণ্ঠে ‘আমি বনফুল গো’ গানটি খ্যাতির শিখরে উঠেছিল। এই ছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন কমল দাশগুপ্ত।
গীতিকার হিসাবে ১৫২টি ছবিতে কাজ করার পাশাপাশি তিনি তিনটি ছবির পরিচালক, কুড়িটি ছবির চিত্রনাট্য রচনার সঙ্গে আটটি ছবিতে অভিনয়ও করেছেন। পৃথিবী আমারে চায় (১৯৫৭) ছবিতে গীতা দত্তর কণ্ঠে তাঁর লেখা ‘নিশি রাত বাঁকা চাঁদ আকাশে’ এবং ‘তুমি বিনা এ ফাগুন বিফলে যায়’ গান দুটি জনপ্রিয় হয়েছিল।

উত্তম সুচিত্রা অভিনীত চন্দ্রনাথ (১৯৫৭) ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে তাঁর লেখা ‘রাজার দুলালী সীতা বনবাসে যায়’ গানটিও জনপ্রিয় হয়েছিল। চলচ্চিত্রের সাথে তাঁর লেখা অনেক আধুনিক গানও জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
প্রমথেশ বড়ুয়া, নীতিন বসু, নীরেন লাহিড়ী, তরুণ মজুমদার, সুবল দাশগুপ্ত, সুকুমার দাশগুপ্ত, রবীন চট্টোপাধ্যায়, হিমাংশু দত্ত, রাইচাদ বড়াল, নচিকেতা ঘোষ, কমল দাশগুপ্ত ইত্যাদি পরিচালক এবং সংগীত পরিচালকদের সাথে তিনি কাজ করেছেন, তাঁর লেখা গানে যে সব বিশিষ্ট শিল্পী কণ্ঠ দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, তালাত মামুদ, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, শচীন দেববর্মণ, কানন দেবী, রবীন মজুমদার, অসিতবরণ, কুন্দনলাল সায়গল ইত্যাদি।
তাঁর শেষ কাজ কবি (১৯৭৫) ছবিতে। এই ছবির পরিচালক সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগ্রহে তিনি এই ছবির চিত্রনাটাও রচনা করেন এবং সংগীত পরিচালক অনিল বাগচীর আগ্রহে এই ছবির গানও তিনি লিখেছিলেন।
১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে তাঁর জীবনাবসান হয়।
চলচ্চিত্রপঞ্জি —
- ১৯০৬ পণ্ডিতমশাই,
- ১৯৩৯ রুক্মিণী,
- ১৯৪১ রাসপূর্ণিমা, পরিচয়,প্রতিশ্রুতি, নন্দিনী, ব্রাহ্মণ কন্যা,
- ১৯৪২ নারী, গরমিল, পতিব্রতা:
- ১৯৪৩ আলেয়া, সহধর্মিণী, কাশীনাথ, দিকশূল, দম্পতি, বিচার, দেবর, পোষ্যপুত্র:
- ১৯৪৪ নন্দিতা,
- ১৯৪৫ দোটানা, বন্দিতা, কলঙ্কিনী:
- ১৯৪৬ মৌচাকে ঢিল, সাত নম্বর বাড়ী, এই তো জীবন, বিরাজ বৌ:
- ১৯৪৭ মন্দির, পথের দাবী, শৃঙ্খল, রাত্রি জাগরণ:
- ১৯৪৮ স্বর্ণসীতা, সাধারণ মেয়ে, বঞ্চিতা, কালো ঘোড়া, মহাকাল:
- ১৯৪৯ রাঙামাটি, বামুনের মেয়ে, নিরুদ্দেশ, অনুরাধা, কার্টুন,
- ১৯৫০ ধীরেশ লাহিড়ী, যুদ্ধদেবতা, সঞ্চালী, মেজদিদি, বৈকুণ্ঠের উইল, সন্ধ্যাবেলার রূপকথা, মাইকেল মধুসুদন, গরবিনী, শেষবেশ, দ্বৈরথ, ইন্দ্রজাল,
- ১৯৫১ কুলহারা, সে নিল বিদায়, নিয়তি,
- ১৯৫২ জবানবন্দী, প্রার্থনা, অনামী:
- ১৯৫৩ কাজরী, রোশেনারা, লাখ টাকা, রাখী:
- ১৯৫৪ এটম বম্, ভক্ত বিশ্বমঙ্গল, মনের ময়ূর, সতীর দেহত্যাগ, বিক্রম উব্বশী, নববিধান, ঢুলী, মরণের পরে, মণি আর মানিক, সতী, বারবেলা, সতী বেহুলা,
- ১৯৫৫ অপরাধী, বীর হাম্বীর, বিধিলিপি, কথা কও, দেবী মালিনী, ব্রতচারিণী, দৃষ্টি:
- ১৯৫৬, মহানিশা, ভোলামাষ্টার, সাগরিকা, সাহেব বিবি গোলাম, শুভরাত্রি, পরাধীন মামলার ফল, পাপ ও পাপী, মানরক্ষা, ফল্গু, দানের মর্য্যাদা, শুভলগ্ন, শিল্পী, চোর
- ১৯৫৭ মধুমালতী, হারজিৎ, বড়মা, পৃথিবী আমারে চায়, নীলাচলে মহাপ্রভু, অভয়ের বিয়ে, চন্দ্রনাথ
- ১৯৫৮ সোনার কাঠি, তানসেন, ডাক্তারবাবু, সাধক বামাক্ষ্যাপা,
- ১৯৫৯ জলজঙ্গল, পুষ্পধনু, ছবি,
- ১৯৬০ নদের নিমাই,
- ১৯৬১ বিষকন্যা:
- ১৯৬২ বন্ধন, রক্তপলাশ মায়ার সংসার
- ১৯৬৩ অবশেষে, বর্ণালী, দ্বীপের নাম টিয়ারং, আকাশ প্রদীপ, বিনিময় হাসি শুধু হাসি নয়, সূর্য্যশিখা, শ্রেয়সী:
- ১৯৬৪ অগ্নিবন্যা, দীপ নেভে নাই, মোমের আলো, কাঞ্চনরঙ্গ, কে তুমি:
- ১৯৬৫ দেবতার দীপ, গুলমোহর,
- ১৯৬৬ জোড়াদীঘির চৌধুরী পরিবার, সুশান্ত সা;
- ১৯৬৭: দেবীতীর্থ কামরূপ কামাখ্যা, গৃহদাহ, প্রস্তর স্বাক্ষর, এন্টনী ফিরিঙ্গী:
- ১৯৬৮ গড় নাসিমপুর, বৌদি:
- ১৯৬৯ পিতাপুত্র, পরিণীতা, কমললতা, মা ও মেয়ে, অপরিচিতা, আরোগ্য নিকেতন;
- ১৯৭০ শাস্তি, কলঙ্কিত নায়ক, মেঘ কালো,
- ১৯৭১ ধন্যি মেয়ে, ফরিয়াদ, ভানু গোয়েন্দা গ্রহর অ্যাসিস্ট্যান্ট,
- ১৯৭২ অপর্ণা, নায়িকার ভূমিকায়, বহুরূপী,
- ১৯৭৩ দুরন্ত জয়, আমি সিরাজের বেগম;
- ১৯৭৪ আলোর ঠিকানা।
