নিউ থিয়েটার্স: বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং আলোচিত প্রযোজনা সংস্থা। বিলেত ফেরত ইঞ্জিনিয়ার বীরেন্দ্রনাথ সরকার প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা সবাক যুগের প্রথম থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত বাংলা, হিন্দী, উর্দু, তামিল, তেলুগু, এবং ইংরাজি ভাষায় একশো পঞ্চাশটিরও বেশি কাহিনিচিত্র, কার্টুন চিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিল।

নিউ থিয়েটার্স
১৯৩১ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়। নিউ থিয়েটার্সের প্রযোজনায় নির্মিত প্রথম ছবি শরৎচন্দ্রের কাহিনি অবলম্বনে দেনাপাওনা (১৯৩১)। ছবিটি পরিচালনা করেন প্রেমাঙ্কুর আতর্থী। নিউ থিয়েটার্স প্রযোজিত প্রথম সাতটি ছবি দর্শক আনুকূল্য লাভে বঞ্চিত হয়।
দেবকী বসু পরিচালিত চণ্ডীদাস (১৯৩২) বক্স অফিসে সাফল্য লাভ করে এবং সর্বকালীন রেকর্ড ভেঙে একাদিক্রমে ১৭ সপ্তাহ ধরে প্রদর্শিত হয়। এই ছবি মুক্তির মধ্য দিয়ে নিউ থিয়েটার্সের স্বর্ণ যুগের সূচনা ঘটে। ছবিটির কাহিনি বিন্যাস, সংগীতাংশ, কারিগরি দক্ষতা, সর্বোপরি ছবিটির ভক্তিরসের আবেদন ছবিটিকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়।
দেবকী বসু পরিচালিত ভক্তিরসাত্মক হিন্দী ছবি পুরাণ ভকত্ (১৯৩৩) নিউ থিয়েটার্সকে সর্বভারতীয় পরিচিতি এনে দেয়। পরবর্তী বছরগুলিতে বাংলা হিন্দী বিভাষিক ছবিগুলি সহ অন্যান্য ছবিগুলিও হাতিমার্কা নিউ থিয়েটার্সকে একটি সফল ব্র্যান্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

দেবকী বসু ছাড়াও পরিচালকদের মধ্যে প্রমথেশ বড়ুয়া, নীতিন বসু, হেমচন্দ্র চন্দ্র, বিমল রায়, সুবোধ মিত্র, অমর মল্লিক, ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, দীনেশরঞ্জন দাস সহ বিভিন্ন পরিচালকের সফল শিল্প সৃষ্টিগুলি নিউ থিয়েটার্সকে একটি সুদৃঢ় আর্থিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা দেয়। কার্যকলাপ বৃদ্ধির ফলে আনোয়ার শাহ রোডে একটি এবং লাহোরে (বর্তমানে পাকিস্তানে) দুটি নতুন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হয়।
স্বনামধন্য পরিচালকদের পাশাপাশি প্রমথেশ বড়ুয়া, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, কানন দেবী, মলিনা দেবী, উমাশশী, কুন্দনলাল সায়গল, পাহাড়ী সান্যাল, পৃথ্বীরাজ কাপুর, চন্দ্রাবতী দেবী সহ বহু অভিনেতা এবং অভিনেত্রী নিউ থিয়েটার্সে তাদের কর্ম জীবন শুরু করেছেন।
নেপথ্য সংগীত গ্রহণের প্রথম সফল প্রয়োগ সহ বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ, ভাষা শিক্ষা এবং সংগীত শিক্ষার ব্যবস্থা সহ বিভিন্ন সুযোগের ফলে কলাকুশলীরা অনেকেই পরবর্তী সময়ে সফল পরিচালক হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। রাইচাঁদ বড়াল এবং পঙ্কজ মল্লিকের সফল সংগীত পরিচালনাও নিউ থিয়েটার্স প্রযোজিত ছবিগুলিকে আলাদা মাত্রা এনে দিত।

একদিকে চণ্ডীদাস (১৯৩২), পুরাণ ভকত্ (১৯৩৩), মীরাবাই (১৯৩৩), বিদ্যাপতি (১৯৩৮)-এর মতো ভক্তিমূলক ছবির সাথে সাথে দেবদাস (১৯৩৫)-এর মতো আবেগসর্বস্ব ছবিগুলির পাশাপাশি বাজত জয়ন্তী (১৯৩৯)-র মতো হাসির ছবিও নিউ থিয়েটার্সের ছত্রচ্ছায়ায় নির্মিত হয়েছে।
আবার অন্যদিকে উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণের বিষয় নিয়ে প্রেসিডেন্ট (১৯৩৬), দিদি (১৯৩৭), দেশের মাটি (১৯৩৮)-র মতো ছবিগুলির পাশাপাশি মুক্তি (১৯৩৭), উদয়ের পথে (১৯৪৪), অঞ্জনগড় (১৯৪৮) ইত্যাদির মতো আধুনিক বিষয় নিয়েও ছবি তৈরি হয়েছিল।
কাহিনিচিত্র নির্মাণের পাশাপাশি নিউ থিয়েটার্স দৈর্ঘ্য চিত্র, তথ্যচিত্র, সংবাদচিত্র সহ কার্টুন চিত্রও নির্মাণ করেছে।
অযথা অপচয় ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে কাঁচা ফিল্মের অভাব, যুদ্ধ-সহযোগী ছবি তৈরির জন্য সরকারি চাপ এবং সর্বোপরি দাঙ্গার কারণে প্রেক্ষাগৃহগুলিতে জনসমাগমের অভাবের দরুন অন্যান্য স্টুডিওগুলির মতো নিউ থিয়েটার্সকেও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। ১৯৫৫ সালে তাদের শেষ ছবি হিন্দী বকুল মুক্তি পায়।
চলচ্চিত্রপঞ্জি (বাংলা)—
- ১৯৩১ দেনাপাওনা।
- ১৯৩২ পুনর্জন্ম চিরকুমার সভা, নটীর পূজা, পল্লী সমাজ চণ্ডীদাস।
- ১৯৩৩ মাসতুতো ভাই, কপালকুণ্ডলা, সীতা, মীরাবাই:
- ১৯৩৪ কলো
- ১৯৩৫ দেবদাস, বিজয়া, ক্রোড়পতি, অবশেষে, ভাগ্যচক্র
- ১৯৩৬ হামাযা
- ১৯৩৭ দিদি মুক্তি,
- ১৯৩৮ বিদ্যাপতি, অভিজ্ঞান, অধিকার, দেশের মাটি, সাথী ১৯৩৯ বড়দিদি, সাপুড়ে, রজত জয়ন্তী।
- ১৯৩৯ জীবনমরণ;
- ১৯৪০ ডাক্তার, অভিনেত্রী আলোছায়া:
- ১৯৪১ নর্তকী, পরিচয়, প্রতিশ্রুতি:
- ১৯৪২ পরাজয়, শোধবোধ, মীনাক্ষী,
- ১৯৪৩ কাশীনাথ, প্রিয় বান্ধবী, দিকশূল:
- ১৯৪৪ উদয়ের পথে:
- ১৯৪৫ দুই পুরুষ
- ১৯৯৬ বিরাজ বৌ
- ১৯৪৭ নার্স সিসি।
- ১৯৪৮ অঞ্জনগড়, প্রতিবাদ।
- ১৯৪৯ মহ, বিষ্ণুপ্রিয়া,
- ১৯৫০ রূপকথা, শ্রীতুলসীদাস।
- ১৯৫১ পরিত্রাণ, স্পর্শমণি:
- ১৯৫২ মহাপ্রস্থানের পথে,
- ১৯৫৩ বনহংসী, নবীন যাত্রা,
- ১৯৫৪ নদ ও নদী, বকুল, লেডিস সিট।
হিন্দী —
- ১৯৩৩ পুরাণ ভকত্, রাজরানি মীরা;
- ১৯৩৪ চণ্ডীদাস, রূপলেখা, মহব্বত কি কসউটি
- ১৯৩৫ মিলিওনিয়র, দেবদাস, ধূপছাও,
- ১৯৩৬ পূজারীন, মজ্ঞিল, মায়া, প্রেসিডেন্ট,
- ১৯৩৭ অনাথ আশ্রম, মুক্তি:
- ১৯৩৮ বিদ্যাপতি, অভাগীন, অধিকার, ধরতিমাতা, স্ট্রীট সিঙ্গার, দুষমন:
- ১৯৩৯ বড়দিদি, সপেড়া, কপালকুণ্ডলা, জওয়ানী কি রীত:
- ১৯৪০ জীন্দেগী, আঁধী, নর্তকী, হারজিৎ,
- ১৯৪১ লগন, ডাক্তার,
- ১৯৪২ সৌগন্ধ, মীনাক্ষী:
- ১৯৪৩ কাশীনাথ, ওয়াপস:
- ১৯৪৪ মাই সিস্টার;
- ১৯৪৫ হামরাহী ওয়াসিতনামা
- ১৯৪৮ অঞ্জনগড়, নিচ
- ১৯৪৯ ছোটা ভাই, মঞ্জুর:
- ১৯৫০ পহেলা আদমী, রূপ কহানী:
- ১৯৫২ যাত্রিক,
- ১৯৫৩ নয়া সফর:
- ১৯৫৫ বকুল।
উর্দু—
- ১৯০১ মহব্বত কি আঁসু
- ১৯৩২ জিন্দা লাশ, সুবহ কা সীতারা, জোশ মহব্বত
- ১৯৩৩ ইহুদি কি লড়কি, দুলারী বিবি;
- ১৯৩৪ ডাকু মনসুর:
- ১৯৩৫ কারওয়ানি হায়াত, জোশ ইন্তকাম।
অন্যান্য ভাষা—
- ১৯৩৩ নন্দনার (তামিল)
- ১৯৩৪ কোভালাম (তামিল),
- ১৯৩৫ নাল্লাথাঙ্গল (তামিল), কিং ভোজা (তামিল):
- ১৯৩৬ দেবদাস (তামিল);
- ১৯৫৩ যান্ত্রিক( তেলেগু)।
কার্টুন ছবি —
- ১৯৩৪ . পি ব্রাদার্স, অন এ মুনলিট নাইট।
- ১৯৫০ – মিচকে পটাশ।
স্বল্পদৈর্ঘ্য তথ্যচিত্র, সংবাদচিত্র —
- ১৯৩২ ডা টেগর’স রিমাই (ইংরাজি),
- ১৯৩৩ ইদস সও (ইংরাজি), ফিউনেরাল প্রসেশন অফ জে. এম. সেনগুপ্ত (ইংরাজি):
- ১৯৩৪ আর্থকোয়েক ইন বিহার (ইংরাজি), এক্সকিউজ মী স্যার (হিন্দী);
- ১৯৩৫ কোকেনস এন্ড কেলিস কট নিটিং (ইংরাজি), মিঃ এন্ড দা বয়েজ, মিউজিক্যাল মোমেন্ট (ইংরাজি),
- ১৯৩৬ মদ কি (বাংলা), ভারতনুজাম (হিন্দী),
- ১৯৩৭ অর্থ (বাংলা),
- ১৯৩৮ অচিন প্রিয়া (বাংলা), অতঃপর (বাংলা), গ্রেহন্ড রেসিং (ইংরাজি):
- ১৯৩৯ এ. আই. সি. সি. মিটিং ক্যালকাটা (বাংলা),
- ১৯৪৮ হামারা কর্তব্য (হিন্দী)।
প্রকাশনা-
পিনাকী চক্রবর্তীর লেখা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নিউ থিয়েটার্স ২০০৬ সালে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয়। এছাড়াও বাগীশ্বর ঝার লেখা বীরেন্দ্রনাথ সরকারের উপর ইংরাজি গ্রন্থ ১৯৯০-এ সীগাল বুকস থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।
