আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ বাটারফ্লাইস টাং ।
বাটারফ্লাইস টাং
বাটারফ্লাইস টাং
চলচ্চিত্রের কাহিনী সংক্ষেপ :
ছাত্র এবং শিক্ষকের মধুর সম্পর্কে মাঝে যুদ্ধের উপস্থিতি কিভাবে সম্পর্ক বদলে দেয়— স্পেনের গৃহযুদ্ধের আলোকে যুদ্ধবিরোধী চলচ্চিত্র।
দেশ : স্পেন
পরিচালক : জোসি লুইস কিউরেদা
লেখক : জোসি লুইস
রাফেল এজকোনো
ম্যানুয়েল রিভাস
রিলিজ ডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯
মুখ্য চরিত্র : ফার্নেন্দো ফারনান গোমেজ
ম্যানুয়েল লোজানো
উক্সিয়া ব্লানকো
বাটারফ্লাইস টাং
যে ছাত্রকে লাঠিসোটা হাতে নিয়ে বিপরীত পক্ষকে শায়েস্তা করার জন্য মারমুখী হয়ে দৌড় লাগাতে হয় সেই ছাত্রটি ভালোভাবেই জানে কি অবস্থায় কি কারণে তাকে এই কাজটি করতে হলো কাজটি করতে কে বাধ্য করালো, কিভাবে করলো কিংবা সে নিজে নিজেই করলো কি না প্রশ্ন সেটি না ।
প্রশ্নটি হলো ঐ মারমুখী ছাত্রটি যদি বিপরীত পক্ষকে মারতে মারতে হঠাৎ খেয়াল করে বিপরীত পক্ষে পড়ে গেছে তার প্রিয় শিক্ষক তখন কি করবে ছাত্রটি। শিক্ষকের ভাব এবং আদর্শের কারণে শিক্ষক বিপরীত পক্ষে, ফলে অন্তত সেই সময় বাস্তবতায় শিক্ষক শত্রুদলের কিন্তু শিক্ষক তো শিক্ষক।
মা এবং বাবার পরেই তো শিক্ষক। গুরুজনেরা বলেন, শিক্ষক ছাত্রকে যদি একটি মাত্র অক্ষরও শিখিয়ে থাকেন তবে পৃথিবীতে এমন কোনো জিনিস নেই যা দিয়ে ছাত্র শিক্ষকের ঋণ শোধ করতে পারে। ফলে কি করবে মারমুখী ছাত্রটি!
বিবেক মানবিকতা বিসর্জন দিয়ে পাশবিকতা নিয়ে উদ্ধতভাবে এগিয়ে যাবে শিক্ষকের দিকে নাকি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজের দলবলের রোষানলের হাত থেকে শিক্ষককে বাঁচিয়ে নিরাপদে ফিরবে।
নিরাপদে ফিরুক আর নাই ফিরুক যুদ্ধ কিভাবে মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে, বিভেদ বিভাজন কিভাবে নীতি বিবেককে গলাটিপে হত্যা করে, বাঁচার স্বার্থে কোন অবস্থায় মানুষকে সময় উপযোগী সংলাপ উচ্চারণ করতে হয় সেই ঘটনা নিয়ে ১৯৩৬ সাল থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ইউরোপের দেশ স্পেনের গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে স্পেনের পরিচালক জোসি লুইস কিউরেদার অসামান্য চলচ্চিত্র ‘বাটারফ্লাইস টাং।
একজন শিক্ষক এবং তার অনুরাগী ছাত্রের মধুর সম্পর্ক এবং সেই মধুর সম্পর্কের মধ্যে তেড়ে আসা বুনো ষাঁড়ের মতো হঠাৎ যুদ্ধের উপস্থিতি নিয়ে চলচ্চিত্র বাটারফ্লাইস টাং।
চলচ্চিত্রের শুরুতে দেখা যায় রাতের বিছানায় শায়িত দশ বছর বয়সের শিশু মনকো গভীর চিন্তায় নিমগ্ন। তার চিন্তার বিষয় আগামীকাল সাত সকালে যে স্কুলে যাবো তা মাস্টার মশাই কি জোড়া বেত দিয়ে বেতাবে নাকি বেঞ্চির উপর কান ধরে দাঁড় করাবে। না না পড়া না পারলে কিংবা প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পারলে শাস্তি তো নিশ্চিত।
মানুষকে যেমন বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে খায় তেমনি নানা কাল্পনিক দুশ্চিন্তা শিশু মনকোকে তাড়া করে ফেরে। অপরদিকে মনকোর বড় ভাই আন্দ্রে গভীর মনোযোগে সেক্সোফোনে গানের সুর তুলতে ব্যস্ত। সেক্সোফোনের মতো ঐ রকম একটি যন্ত্র থেকে কিভাবে এরকম সুরেলা সুর বের হতে পারে সেটা ভাবতে ভাবতেই ঘুমের অভলে ডুব দেয় মনকো।
মনকো মায়ের হাত ধরে স্কুলে যায়। ইউরোপে শিশুদের আগে খেলাধুলা তার পর পড়াশোনা। খেলা শেষে গায়ের ওজনের থেকে বেশি ওজনের ব্যাগ পিঠে ঝুলিয়ে মনকো ক্লাসরুমে ঢুকে বেঞ্চিতে বসে। ক্লাসে উপস্থিত শিক্ষক ডন গেরিগরি।
রোল কল শেষে নতুন ছাত্র মনকোকে ব্লাকবোর্ডের সামনে ডাকেন, জিজ্ঞাসা করে তোমার নাম কি? স্যার আমার নাম স্প্যারো। শিক্ষক বলেন, তোমার নাম স্প্যারো মানে তুমি ছোট পাখি। তা পাখিই যখন তখন বই খাতা নিয়ে ক্লাসে কেন।
তুমি সোজা বন-বাদাড়ে দৌড় দাও। সেখানে গাছপালা, লতাপাতায় উড়াউড়ি করো। স্প্যারোর জন্য বাগানই ঠিক। সাথে সাথে ক্লাসজুড়ে দুষ্ট ছেলেদের হাসির হুল্লোড়। কি মজা পাখির ছানা, খায় শুধু চালের কণা। তার নাম স্প্যারো শুনে ক্লাসভর্তি ছাত্রদের উপহাসে তার মনে হয় সে যেন সার্কাসের ক্লাউন। নার্ভাসের জায়গা থেকে মনকো প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলে।
প্যান্ট ভিজে যাওয়া দেখে আবার ছাত্রদের হাসির হুল্লোড়। বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর স্প্যারোর প্যান্ট দিয়ে, রোদ বৃষ্টির বিয়ে হবে ডালিম গাছের তিলে। এত বড় লজ্জা উপহাস আর সহ্য করা যায় না। মনকো ব্যাগ নিয়ে সোজা ভোঁ দৌড়। পিছন থেকে শিক্ষক যতই ডাকুক স্প্যারো শোন থাম স্প্যারো যেও না স্প্যারো। কে শোনে কার কথা। শিশুরা স্বভাবতই অনুভূতিপ্রবণ।

কে তাকে প্রশংসা করলো আর কে তাকে নিয়ে টিটকারি করলো তা তারা ভালোই বোঝে। লজ্জা অপমান থেকে বাঁচতে সে যেয়ে বাগানে আশ্রয় নেয়। রাতে বাবা-মা আত্মীয়স্বজন টর্চের আলো জ্বেলে অন্ধকারে বাগান থেকে মনকোকে খুঁজে বাড়িতে নিয়ে আসে। সিন্ধান্ত হয়। মনকো যতদিন না চাইবে ততদিন সে স্কুলে যাবে না।
পরের রাতে স্কুলের শিক্ষক ডন গেরিগরি মনকোদের বাড়িতে এসে মনকোর মায়ের সাথে কথা বলেন। বলেন, দেখুন আমার ব্যবহারে সে আহত। হয়েছে। আপনি যত না-ই বলুন আমি তার সাথে দেখা না করে যাবো না।
সে আমার ছাত্র। তার মনের ক্ষত সারানোর দায়িত্বও আমার। আপনি তাকে ডাকুন। পাশের ঘর থেকে স্যারের ব্যকুলতা শুনে মনকোর ভালো লাগে।মনকো স্যারের দিকে এগিয়ে আসে। সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যায়, মনকো নিয়মিত ক্লাস করতে থাকে।
মনকোর ভাই আন্দ্রেকে তার শিক্ষক সেক্সোফোন বাজানোর ক্ষেত্রে দুটি টিপস দেয়। সেই শিক্ষক বলেন, ইট-পাথর ভাঙার জন্য তুমি যেভাবে হাতুড়ি ধরবে ঠিক সেভাবে সেক্সোফোন ধরলে তো যন্ত্র থেকে সুর বেরোবে না।
একজন প্রিয়তমা তার প্রেয়সীকে যেভাবে কোমলভাবে ধরে তোমার ধরাটাও হবে সেভাবে। তবেই না যন্ত্র সুর হয়ে ধরা দেবে। দ্বিতীয় টিপস, নদীর ওপারের কাউকে ডাকতে এপারে তুমি যে দম নিয়ে ডাকবে, নিশ্চয়ই সামনের মানুষটাকে ডাকতে সেই একই দম প্রয়োগ করবে না।
শিক্ষক ডন গেরিগরি ছাত্র মনকোকে নিয়ে প্রকৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। একটা ফুল দেখিয়ে বলেন, এই ফুলের এক অংশে থাকে মধু অপর অংশে থাকে বিষ। বিষ অংশটুকু খায় মাকড়সা আর মধুর অংশটুকু খায় মৌমাছি।
ভালো আর মন্দের মধ্যে থেকে ভালো অংশ নিতে হবে। যার যতটুকু প্রাপ্য তাকে ততটুকু দিতে হবে। স্বাধীনভাবে বাঁচতে হবে। এরকম একসময় হঠাৎ করে মনকোর পূরনো এক রোগ প্রকাশ পায়। হাঁপানি রোগীদের ইমার্জেন্সি যেমন ইনহেলার নিতে হয় তেমনি ঐ রোগে এক ব্লাডারের বাতাস নিতে হয়। কিন্তু এডুকেশনাল ঐ ট্যুরে সেই ব্লাডার সাথে আনতে মনকো ভুলে গেছে। সে অজ্ঞান।
কিন্তু শিক্ষক পরম যত্নে কোলে নিয়ে হ্রদের স্বচ্ছ জলে মনকোকে ভিজিয়ে সে যাত্রা তার জীবন বাঁচান। মনকোর মা পরে সব জেনে কৃতজ্ঞতায়, শ্রদ্ধায় নিজের দর্জি স্বামীকে বলে শিক্ষক ডন গেরগরিকে একটা কমপ্লিট স্যুট বানিয়ে দেন।
ফায়ারিং-এর মধ্য দিয়ে স্পেনের ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। হাজার হাজার ষড়যন্ত্রের সমষ্টি যেমন যুদ্ধ তেমনি যুদ্ধক্ষেত্রে মিত্র-শত্রুদের অভাব নেই। ইতালির মুসোলিনি, জার্মানির অ্যাডলফের আশীর্বাদপুষ্ট সেনাবাহিনী তখন স্পেনের ক্ষমতায় ।
অপরদিকে সমাজতান্ত্রিক মতবাদ নিয়ে, সাম্যের গান গেয়ে মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানো সোভিয়েত সমর্থনপুষ্ট স্পেনের রিপাবলিকান মানুষেরা কোণঠাসা। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ক্ষমতাবানদের বিশ্বাস। রাইফেলের বুলেটের শক্তির থেকে শিক্ষকদের, বুদ্ধিজীবীদের কথা কিংবা কবি-সাহিত্যিকদের কলমের শক্তি অনেক বেশি ধারালো।
ফলে নিশ্চিহ্ন করো এসব বিরোধীশক্তিকে। মারা পড়ছে বুদলেরই অসংখ্য নিরীহ মানুষ। বুদ্ধিজীবীদের তুলে নিয়ে বধ্যভূমিতে শেষ করে দেয়া হচ্ছে। স্পেনের অলংকার কাব্যনাট্যকার ফেদরিকো গারথিয়া লরকার মতো কবিপ্রতিভাকে যেখানে মেরে ফেলা হচ্ছে সেখানে নিরীহ শিক্ষক কিভাবে বাদ যাবেন।
আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশ যখন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের পরে বলেছিলেন, সন্ত্রাস নির্মূল যুদ্ধে অংশ তোমাকে নিতেই হবে, হয় তুমি আমাদের বন্ধু নইলে শত্রু। সেই সংকটে ইচ্ছা থাক বা না থাক পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফকে যেমন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে বুশের সাথে সহমত প্রকাশ করতে হয়েছিল তেমনি দৃশ্য দিয়েই চলচ্চিত্র বাটারফ্লাইস টাং শেষ হয়ে যায়।
স্কুল থেকে একে একে শিক্ষকদের বের করা হচ্ছে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। রাস্তার দুই পাড়ে সাধারণ মানুষের ভিড়। নিয়ে যাওয়া শিক্ষকদের বিপক্ষে স্লোগান দিয়ে সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হচ্ছে আমরা রিপাবলিকান নই, আমরা ক্ষমতাধরদের সঙ্গে। লাইনের ভিড়ে মনকো, বড় ভাই আন্দ্রে, মনকোর মা ও বাবা। গানের শিক্ষককে দেখে চোখে জল এসে গেছে আন্দ্রের তবু কন্ঠে শ্লোগান রিপাবলিক নিপাত যাক।
শিক্ষক ডন গেরিগরিকে দেখে বিহ্বল মনকো। এই সেই শিক্ষক যে তাকে একবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। এই সেই শিক্ষক যাকে স্যুট দিতে পারাটা ছিল তাদের আনন্দের উৎসব। এই সেই শিক্ষক যিনি ক্লাসের এক ছাত্রকে সুবিধা দেয়ার জন্য ছাত্রের মেয়র বাবার দেয়া প্রলোভনকে উপেক্ষা করেছে। এই সেই শিক্ষক যিনি মাকড়সা হয়ে বিষ না নিয়ে মধু নিতে বলেছিলেন।

অপরদিকে তাক করা বন্দুকের নল। হয় বন্ধু নচেৎ শত্রু। হতবিহ্বল মনকো পথ থেকে পাথরকণা তুলে নিয়ে তার আত্মার আত্মীয় প্রিয় শিক্ষক ডন গেরিগরির দিকে তাক করে। মনকোর মুখের ক্লোজ শটে ক্যামেরা ফিক্সড হয়। ওভার ভয়েসে ভেসে ওঠে ডিরেক্টরিয়াল কন্ঠস্বর, স্পেনের গৃহযুদ্ধের শুরু। আর সেখানেই শেষ হয় চলচ্চিত্র ‘বাটারফ্লাইস টাং।
