ভাবনায় অভাবনীয় ইউরোপের চলচ্চিত্র 

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ ভাবনায় অভাবনীয় ইউরোপের চলচ্চিত্র ।

ভাবনায় অভাবনীয় ইউরোপের চলচ্চিত্র

 

ভাবনায় অভাবনীয় ইউরোপের চলচ্চিত্র 

 

ভাবনায় অভাবনীয় ইউরোপের চলচ্চিত্র

মানুষের জীবন বড় অদ্ভুদ। মা-বাবার কোল আলো করে মানুষ আসে একা আবার জীবন পরিক্রমা শেষ করে পড়ন্তবেলায় আপনজন আত্মীয়স্বজনকে চোখের জলে ভিজিয়ে চিরদিনের মতো চলে যায়ও একা। আসা-যাওয়ার এই একাকিত্বের মাঝে একজন মানুষ যে বহু মানুষের মাঝে নিজেকে তুলে ধরে সেটা মানুষটি করে তার করণীয় কর্ম সম্পন্নের মধ্য দিয়ে।

কর্ম সঠিকভাবে সম্পন্ন করার স্বার্থে কর্মের প্রস্তুতিটা যদিও বা এককভাবে করা চলে কিন্তু পরিবেশনের সময় একা একা চললে চলাটা ঠিক দানা বাঁধে না। যেমন একা একা প্রেম করা চলে না, একা একা মঞ্চে অভিনয় করা চলে না। প্রেম করতে যেমন দোকার দরকার হয় তেমনি মঞ্চাভিনয়ের সময় অভিনেতা এবং দর্শকের যুগলসন্ধি না হলে নাটকটা করে মনে স্বস্তি হয় না।

অভিনয়ের স্বস্তির জন্য যেমন দিনের পর দিন রাতের পর রাত রিহার্সেল রুমে অভিনেতা-অভিনেত্রীর প্রস্তুতি চলে ঠিক তেমনি যে ভাবাদর্শ নিয়ে নাট্যকর্মীরা নিজেদেরকে তৈরি করেছে নাট্য প্রযোজনা শেষে সেই ভাবাদর্শ যদি দর্শক হৃদয়ে প্রবেশ করে, দর্শক হৃদয়ে অনুরণন হয়, দর্শকদের কল্পনাশক্তি যদি আরো প্রসারিত হয় তবে সফল নাটক মঞ্চস্থ করার সুবাধে নাট্যকলাকুশলীরা পরম তৃপ্তি লাভ করে।

লাভ-লোকসানের কথা সব সময় মাথায় না রেখেই চলচ্চিত্র অভিনয়ে মনপ্রাণ ঢেলে, ধ্যানে-জ্ঞানে আলোচিত চরিত্রের মধ্যে ডুব দিয়ে একেকটা চরিত্রকে সেলুলয়েডের পর্দায় জীবন্ত করে তুলে নিজেই জীবন্ত কিংবদন্তি অভিনেত্রী হয়ে উঠেছেন লিজেন্ড অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন।

সেই সুচিত্রা সেন পরম বিশ্বাসে এবং কাজের গুরুত্ব বুঝে সম্মুখে উপস্থিত জাতীয় দৈনিকের সাক্ষাৎ গ্রহণকারীকে বলেছিলেন, একজন অভিনেত্রীর অভিনয়ের বাইরে আর কিছু বলার নেই। যা কিছু বক্তব্য সেটি অভিনয়ে।

সুচিত্রা সেনের বিশ্বাসে সহমত হয়ে বলাই যায় অভিনয়টাই যদি হয় অভিনেতা-অভিনেত্রীর বক্তব্য তবে লেখাটাও লেখকের বক্তব্য। বক্তব্যপ্রধান লেখা না হলেও কিছু কথা পাঠক-পাঠিকার কাছে সবিনয়ে নিবেদনের আর্তি সব লেখক-লেখিকারই থাকে।

পাঠক-পাঠিকা লেখক-লেখিকা প্রকাশক-প্রকাশিকার মিলনমেলা যেখানে পূর্ণ সেখানেই তো ভাবের আদান-প্রদানের তীর্থক্ষেত্র। চলচ্চিত্র রিভিউ করতে যেয়ে মহৎ চলচ্চিত্রের পরিচালকের নির্মাণ, স্ক্রিপ্ট রাইটারের বক্তব্য বোঝার চেষ্টা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কালজয়ী অভিনয়ের নৈপুণ্য বুঝতে চাওয়া।

সিনেমাটোগ্রাফারের আলো-আঁধারির রহস্যময় গভীরতার চিত্রধারণের ব্যাপ্তি, এডিটরের সক্ষমতায় জঙ্গল রূপ ফুটেজ থেকে যাচাই বাছাই করে পুষ্পশোভিত বাগান সাজিয়ে তোলা, সাউন্ড ম্যানের জগৎসভার কোলাহলমুখর শব্দতরঙ্গ থেকে শব্দ চয়ন, আলোকশিল্পীর সিকোয়েন্সের মুডকে ফুটিয়ে তুলতে আলোর সাথে আলো মিশিয়ে আলোর রোশনাই এতসব দিক যতটুক বুঝে লেখা যায় ততটুকু লিখে শেষ করার আগেই যেখানে রিভিউ এর দৈর্ঘ্য ক্ষেত্রে বিশেষ বড় হয়ে যায়।

সেখানে লেখকের মনের কথা লেখার সুযোগ ও জায়গা আলাদাভাবে পাওয়া সত্যিই কম। তবু অন্ধের যেমন পরম নির্ভর তার একমাত্র লাঠি ঠিক তেমনি ইউরোপের চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গে কিছু অবশ্য জানার মতো কথা লিখে জানানোর জায়গা এই মুখবন্ধ।

মুখবন্ধ রেখেই কলমের লেখা চলচ্চিত্রের রিভিউয়ের পাণ্ডুলিপি নিয়ে যখন ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশের তরুণ যুগা প্রকাশক জহিরুল আবেদীন জুয়েল এবং আদিত্য অন্তরকে দেখানো হলো তখন দেখা গেল মোট রিভিউয়ের মধ্যে মেজরিটি রিভিউ হয়েছে ইউরোপ মহাদেশের বিভিন্ন দেশের।

আমেরিকা, ইল্যান্ড ফ্রান্স, চেক রিপাবলিকান, ইন্ডিয়া, বেলজিয়াম, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র রিভিউ নিয়ে কাজটা চারদিকে ছড়িয়ে না ফেলে। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ ইউরোপ মহাদেশের চলচ্চিত্রের সমষ্টি নিয়ে ইউরোপ চলচ্চিত্র নিয়ে নামে বই করা গেলে সেটা কেমন হয় তার উত্তর খোঁজার প্রয়াসে মিলিত চেষ্টার ফলাফল ইউরোপের চলচ্চিত্র।

ইউরোপের চলচ্চিত্র হোক কিংবা আমেরিকান চলচ্চিত্র হোক মানুষ মাত্রই জানে চলচ্চিত্রের জন্মদাত্রী ফ্রান্স। ফলে ফ্রান্স থেকে এমন একটা চলচ্চিত্র নিয়ে রিভিউ করার ইচ্ছা ছিল যেটি ফ্রান্সের দর্শকের পাশাপাশি বিশ্ববাসী দ্বারা সমান আদৃত। পেয়ে গেলাম ২০০৮ সালে অস্কার পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র লা ভি অ রোজ।

বাংলাদেশে যেমন সাবিনা ইয়াসমিন, ভারতে যেমন লতা মঙ্গেশকর, তেমনি ফ্রান্সের আত্মার কন্ঠস্বর লিজেন্ড গায়িকা এডিথ ফিফ। এই এডিথ ফিফের গায়কি জীবনের টানাপোড়েন এবং গন্তব্যে পৌছার জন্য যে অনুকূল- প্রতিকূল উভয় অবস্থাকে সাদরে গ্রহণ করে এগিয়েই চলতে হয় সেটা যেমন জানা যাবে তেমনি যারা গায়ক-গায়িকা সত্তা নিয়ে বহুর মধ্যে অন্যতম হয়ে।

উঠতে চান তারা তাদের ভাবিপথের একটা সন্ধান চলচ্চিত্রটির মধ্যে পেয়ে যাবেন বলেই বিশ্বাস। উপরন্তু মাইকেল জ্যাকসনের পড়ন্তবেলার সাথে এডিথ ফিফের পড়ন্তবেলার যে একটা সুদূরপ্রসারী মিল আছে সেটা অনুধাবনের মধ্য দিয়ে বোঝা যেতে পারে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছানো মানুষটির জন্য কত বড় চাপ খ্যাতির শীর্ষস্থানটি ধরে রাখা। ধরে রাখতে চাইলেই আপনজনকে সব সময় ধরে রাখা যায় না। দুর্যোগ,

দুর্বিপাক, রোগ-ব্যাধি নানা কারণে নানা সময় ঘটে যায় চিরবিচ্ছেদ। এই চিরবিচ্ছেদের দ্বারপ্রান্তে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত দুই প্রজন্মের দুটি মানুষ। একজন বৃদ্ধ, অপরজন শিশু। চিকিৎসাবিজ্ঞান মতে মৃত্যুর দিন যেখানে প্রায় নির্ধারিত ঠিক সেই সময় শিশু মার্টির প্রাণশক্তির জোরে বৃদ্ধ অ্যান্টনি বেরান্ট-এর নতুনভাবে বেঁচে ওঠার মর্মস্পর্শী ফ্রান্সের কাহিনীচিত্র ‘মার্টিস ওয়ার্ল্ড’। ওয়ার্ল্ডের বিভিন্ন দেশে কবি গল্পকার-ঔপন্যাসিক নাট্যকারদের বিভিন্ন জনের জীবন পরিক্রমা বিভিন্ন রকম।

সেসব কথাসাহিত্যিকের সাহিত্যের মান কারো কারো জলের উপরে ভাসা ভাসা আবার কারো কারো জলের গভীর পর্যন্ত গ্রথিত। ভাসা কিংবা গ্রথিতমান যেটাই হোক না কেন সাহিত্যিকরা যে সাহিত্য সৃজন করেন সেসব ক্ষেত্রে কোনটি বেশি ভূমিকা রাখে কল্পনাশক্তি না কি বাস্তব অভিজ্ঞতা— এ জিজ্ঞাসা পাঠক- পাঠিকার মনে চিরকালের।

এ অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর নিয়েই ফ্রান্সের চলচ্চিত্র ‘সুইমিংপুল’ । একজন ব্রিটিশ গোয়েন্দা উপন্যাসের লেখিকা সারাহ মর্টন কিভাবে তার গোয়েন্দা উপন্যাসটি লিখলেন সেই প্রেক্ষাপট নিয়েই সুইমিংপুল। যেসব পাঠক-পাঠিকা লেখকসত্তা নিয়ে লিখতে চান তারা সবাই কম-বেশি লেখক- লেখিকা হয়ে ওঠার একটা গাইড সুইমিংপুল চলচ্চিত্রে পাবেন বলেই বিশ্বাস । বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়েই করণীয় কাজটা করেন ব্রিটিশ ভদ্রমহিলা ভেরাড্রেক । কাজটা গর্ভপাত করানো।

কুমারী অবস্থায় নানা কারণে কোনো মেয়ে যদি গর্ভবতী হয়ে পড়ে তবে আইনি জটিলতা, লোকলজ্জা, অপদস্ত হওয়া, সুইসাইট বা আত্মহত্যা করার মতো পথ বেছে নেয়া প্রভৃতির বিপরীতে প্রকৃত মনুষ্যত্ব নিয়ে, কোনো পারিশ্রমিক না নিয়ে শুধু মেয়েটিকে বাঁচানোর স্বার্থে বৃদ্ধা ভেরাট্রেক নিজের বিপদ জেনেও কতদূর পর্যন্ত ত্যাগ স্বীকার করতে পারে সেই প্রেক্ষাপট নিয়ে ২০০৪ সালে সেরা পরিচালক, সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য এবং সেরা অভিনেত্রী ক্যাটাগরিতে অস্কারে মনোনীত চলচ্চিত্র পরিচালক মাইক লিগ-এর ভেরাড্রেক ।

ভেরাড্রেক চলচ্চিত্রটি যেমন মানুষের মানবিক দিক জাগ্রত করে ঠিক তেমনি অমানবিক পরিবেশ থেকে জীবনের অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সঠিক সময় সঠিক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দুরাতের মধ্যে দু কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া যায় সেই প্রেক্ষাপট নিয়ে জামাল নামের এক বস্তির ছেলের কোটিপতি হয়ে ওঠার কাহিনী চলচ্চিত্র স্লামডগ মিলিয়নেয়ার।

২০০৯ সালে ৮টি ক্যাটাগরিতে অস্কারজয়ী এ চলচ্চিত্রটি ইন্ডিয়ান হিসেবে জানলেও মূলত পরিচালক এবং প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ব্রিটেনের হওয়ায় চলচ্চিত্রটি ব্রিটেনের তথা ইউরোপের।

ইউরোপের বেশিরভাগ দেশই বুঝে গেছে বিশ্বায়নের এই সভ্যজগতে এককভাবে বেঁচে থাকা কিংবা একা একা পথ চলার দিন শেষ। প্রযুক্তির কল্যাণে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে দূর আর দূরে নেই। দূরের মানুষ কাছে এসেছে কিন্তু বাণিজ্যের ব্যাপ্তি বেড়েছে। চলচ্চিত্র মাধ্যম আজ শুধু বিনোদনের মাধ্যমে শিক্ষাদানে ব্রতীই থাকছে না বরং বহু পথের বহু মানুষকে একই ছাদের তলে নিয়ে আসছে।

লগ্নিকৃত অর্থের পরিমাণ যেমন বাড়ছে বছরে বছরে তেমনি ফেরতপ্রাপ্ত মুনাফার পরিমাণ কোথাও কোনো অংশে কম নয়। ফলে মুক্তবাজার অর্থনীতিকে মাথায় রেখে আমেরিকার সাথে অংশীদারিত্বে সমান অংশীদার এখন ইউরোপের নানা দেশ। ২০০৮ সালে অস্কারে পাঁচ পাঁচটি ক্যাটাগরিতে মনোনীত চলচ্চিত্র ‘ফ্রস্ট/নিক্সন’ চলচ্চিত্রটি যৌথভাবে নির্মাণ করেছে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং আমেরিকা।

যৌথ প্রযোজনায়, সমন্বিত চেষ্টায় কাজের ফলাফল কি দাঁড়ায় সেটা ভেবে যেমন ফ্রস্ট/নিক্সন চলচ্চিত্রের রিভিউ তেমনি বর্তমান জীবদ্দশায় কিংবদন্তি ব্রিটিশ টেলিভিশন সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট কিভাবে আমেরিকার সাঁইত্রিশতম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারি প্রসঙ্গে সাক্ষাৎকারটি নিলেন, ডেভিড ফ্রস্টের সেই প্রস্তুতিপর্বটি স্বচক্ষে দেখার সুযোগ ফ্রস্ট/নিক্সন চলচ্চিত্র।

বাংলাদেশের একটি বড় অংশের মানুষ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স এবং প্রিন্ট মিডিয়ার সাথে কর্মসূত্রে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। সাংবাদিক হিসেবে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে কিভাবে সবার দৃষ্টি কাড়া সম্ভব, একটা ভালো উত্তরের জন্য একটা ভালো।

প্রশ্ন করাটা কতটা জরুরি, একটা ভালো প্রশ্ন করার জন্য সাংবাদিক হিসেবে নিজের হোমওয়ার্কটা ঠিক কি হবে এ রকম নানা প্রশ্নের উত্তর যেমন মিলবে তার থেকে বড় যে উপকার হতে পারে সেটি হলো বিপদে-সম্পদে, দারিদ্র্যে- আভিজাত্যে, জানায়-অজানায়, দূরে-নিকটে, নিরাশায় আশায় শেষপর্যন্ত একজন সাংবাদিকসভার মূল সম্পদ তার অর্জিত জ্ঞান এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা—এটি পাঠক-পাঠিকা অজান্তেই আত্মস্থ করে ফেলবেন টেলিভিশন সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে কাছ থেকে দেখতে পাওয়ায়।

ডেভিড ফ্রস্টকে কাছ থেকে দেখতে পাওয়া গেলেও একজন নাট্যকার মাত্রই জানেন কত অজানা অচেনা চরিত্র নাট্যকারদের মনোজগতে এসে ভর করে, নিজেদের মতো করে কথা বলে, নাটকীয় ঘাত-প্রতিঘাতের জন্ম দিয়ে নাট্যকারের মনোজগতে দোলা দিয়ে নাট্যকারকে ক্ষেত্রবিশেষ বাধ্য করে আবার ক্ষেত্রবিশেষ। প্রেরণা যোগায় একটা নাটক সুন্দরভাবে লিখতে। নাট্যকারদের মনোজগৎ ঠিক কি রকম, কোন অবস্থায় একজন সাধারণ পাঠক-পাঠিকারও মনে হতে পারে।

এখন চাইলে তিনিও আস্ত একটা নাটক লিখে ফেলতে পারেন কিংবা নাটকটা আসলে ঠিক কিভাবে লিখতে হয় সেসব নানা সংশয়ের উত্তরে স্কটিশ নাট্যকার জেএম বেবির জীবনী অবলম্বনে ব্রিটেন-আমেরিকান যৌথ নির্মাণ পরিচালক মার্ক ফরস্টার পরিচালিত জনি ডেপ এবং কেট উইন্সলেট অভিনীত ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্র ‘ফাইন্ডিং নেভারল্যান্ড’। জীবনবিচ্যুত নাটক লিখে নাট্যকার কিভাবে ব্যর্থ হন। আবার জীবনঘনিষ্ঠ নাটক লিখে কিভাবে নাট্যকার সফল হন সে প্রশ্নের উত্তরও পাঠক-পাঠিকা পেয়ে যাবেন ফাইন্ডিং নেভারল্যান্ড চলচ্চিত্রে।

নেভারল্যান্ড নামের একটি জায়গায় মাইকেল জ্যাকসন চিরনিদ্রায় শায়িত হলেও ল্যান্ড বা জমি দখলের জন্য আদিম সভ্যতা থেকে আজ পর্যন্ত যত যুদ্ধ হয়েছে তা বলে শেষ করার মতো নয়। যুদ্ধ যেমন হয়েছে বিশ্বব্যাপী আবার হয়েছে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ তথা গৃহযুদ্ধ।

বিশ্বযুদ্ধ হোক কিংবা গৃহযুদ্ধ হোক, যুদ্ধ যে শেষপর্যন্ত মানুষের সাথে মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে, যুদ্ধনীতি যে মানুষের মনুষ্যত্ব-বিবেকের গলা টিপে ধরে, রণাঙ্গনে ভাইকে ভাইয়ের মুখোমুখি দাঁড় করে, সর্বোপরী যা একটা মানুষ কল্পনায়ও কোনোদিন ভাবেনি এমন কাজ সেই মানুষটিকে দিয়ে করানো হয় সেই ভয়ঙ্কর যুদ্ধকে উপজীব্য করে ১৯৩৬ সাল থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ইউরোপের দেশ স্পেনের গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে স্পেনের পরিচালক জোসি লুইস কিউরেদার অসামান্য যুদ্ধবিরোধী চলচ্চিত্র ‘বাটারফ্লাই’স টাং’।

একজন শিক্ষক এবং তার অনুরাগী ছাত্রের মধুর সম্পর্ক এবং সেই মধুর সম্পর্কের মধ্যে তেড়ে আসা বুনো ষাড়ের মতো হঠাৎ যুদ্ধের উপস্থিতি নিয়ে চলচ্চিত্র বাটারফ্লাই’স টাং। বাংলাদেশের যে কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ পাঠক-পাঠিকাকে কিছু সময়ের জন্য হলেও আবেগে আপ্লুত করবে কারণ ৭১ এখনো স্মৃতিতে টাটকা।

স্মৃতি খুঁজে অতীত উদ্ধারের ইতালির ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্র সিনেমা প্যারাডিসো। বিশ্ব চলচ্চিত্র পরিক্রমায় নিও রিয়ালিজম মতবাদের স্রষ্টা হিসাবে ইতালির একটা স্বতন্ত্র জায়গা রয়েছে। জীবন যেখানে যেমন সেলুলয়েডের পর্দায় ঠিক তেমন তেমনভাবে জীবনকে উপস্থাপনের এই নিও রিয়ালিজম মতবাদের দেশ ইতালি থেকে এমন একটা চলচ্চিত্রের কথা পাঠক-পাঠিকাদের জানানো প্রয়োজন ছিল যেটি দেখলে পাঠক-পাঠিকার সুপ্ত মনে লুকিয়ে থাকা পরিচালক- পরিচালিকা হয়ে ওঠার পথে একটা দিক-নির্দেশনা পেলেও পাওয়া যেতে পারে।

সিনেমা প্যারাডিসো একজন সাধারণ মানুষের ভুবন বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক হয়ে ওঠার কাহিনী। সিনেমা প্যারাডিসো একজন চলচ্চিত্র পরিচালকের বড় হয়ে ওঠাবার ক্ষেত্রে যিনি পথপ্রদর্শক সেই পথপ্রদর্শক প্রজেক্টসনিস্টেরও কাহিনী।

ইতালির এই ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্রটি দেখা যে কোনো দেশের যে কোনো চলচ্চিত্র অনুরাগী মানুষের জন্য সৌভাগ্যের। কারণ দুটি-

  1. চলচ্চিত্রের যে বিভাগের যে সত্তা (যেমন পরিচালক সত্তা, চিত্রনাট্যকার সত্তা, অভিনয় সত্তা প্রভৃতি) নিয়ে দর্শক চলচ্চিত্রটি দেখলেন, দেখার পর সেই সত্তার বাস্তবায়ন করা সহজ হয়।
  2. দেখলেন ইতালির প্রেক্ষাপটে এক অখ্যাত মানুষের ভুবনবিখ্যাত চলচ্চিত্রকার হয়ে ওঠা এবং এক প্রজেক্টসনিস্টের জীবনকাহিনী কিন্তু জেনে গেলেন বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসের শুরু থেকে আজ অবধি গৌরবময় স্বর্ণালী অগ্রযাত্রা।

এত বড় সুযোগ করে দিল ইতালির পরিচালক গিসুপি টরনেটরি তার চলচ্চিত্র সিনেমা প্যারাডিসো নির্মাণের মধ্য দিয়ে, সেই নির্মিত চলচ্চিত্র দেখে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারাটা সৌভাগ্য ছাড়া আর কিইবা হতে পারে!হতে পারে অনেক কিছু। আজ যে ভিখারী কাল সে কোটিপতি হতে পারে আবার আজ যে কোটিপতি কাল সে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে পারে।

বস্তির ছেলের কোটিপতি হওয়া নিয়ে যেমন ভারতের প্রেক্ষাপটে ব্রিটেনের চলচ্চিত্র স্লামডগ মিলিয়নেয়ার তেমনি কোটিপতি হয়ে সম্পদের বিপদে জর্জরিত চেক রিপাবলিকের অস্কার বিজয়ী পরিচালক জিরি মেনজেল এর বিশাল ভূখণ্ডের প্রেক্ষাপটে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘আই সার্ভ দ্য কিং অব ইংল্যান্ড’।

ইউরোপের মোহের হাতছানি, রাজরাজকীয় সুযোগ-সুবিধা, মনুষ্যত্বের মূল্যবোধ কিংবা ইউরোপ রাজনীতির টানাপোড়েনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটের কোলাজ নিয়ে টান টান নাটকীয় ঘনঘটার চলচ্চিত্র আই সার্ভ দ্য কিং অব ইংল্যান্ড।

ইংল্যান্ড হোক কিংবা ফ্রান্স হোক পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় ভালো মানুষের জায়গা সবার আগে। কিন্তু একজন মন্দ মানুষ চাইলেও যে ভালো হতে পারে, ভালো কিছু করতে পারে কিংবা ভালো মানুষের স্পর্শে আপাত মন্দ মানুষটির মনোজগতে উত্তরণ ঘটতে পারে অথবা একটা মানুষ যে নিজে নিজে মন্দ হয় না, তাকে মন্দ বানানো হয় সেসব সামগ্রিক প্রেক্ষাপট নিয়ে জার্মান পরিচালক ক্রিস ক্রস-এর চলচ্চিত্র ফোর মিনিটস।

একজন পিয়ানিস্ট টিচারের সংস্পর্শে এসে খুনের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক কয়েদি কিভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, একজন মানুষের অপরাধী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সে নিজে কতটা দায়ী এবং প্রকৃত সহানুভূতি পেলে মন্দ পথযাত্রীর যে কারোর পক্ষেই যে সংশোধিত হয়ে ওঠা সম্ভব।

সেসব কথা নিয়েই চলচ্চিত্র ফোর মিনিটস। ফোর মিনিটস কেন চল্লিশ বছর ধরে চেষ্টা করেও অনেকে তার গন্তব্যে যেমন পৌঁছাতে পারে না আবার অনেক স্বল্প চেষ্টায় রাতারাতি খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে যায়। স্বল্প সময় লাগুক কিংবা বেশি সময় লাগুক মানুষমাত্রই চায় পৃথিবীতে একটা দাগ কেটে যেতে, ফেমাস ওয়ে উঠতে।

ফেমাস তথা বিখ্যাত হওয়ার এ পথপরিক্রমাটা ঠিক কি রকম সে প্রশ্নের মীমাংসায় বেলজিয়ামের পরিচালক দমেনিক দেরুদার এর নির্মিত চলচ্চিত্র যেটি ফরেন ল্যাংগুয়েজ ফিল্ম ক্যাটাগরিতে অস্কারে মনোনীত হয়েছিল সেই চলচ্চিত্র ‘এভরিবডি ফেমাস’-এ সেই পথপরিক্রমার ওপর আলোক ফেলা হয়েছে।

সুরকার বাবা এবং গায়িকা কন্যার শতসহস্র প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে সুরকার এবং গায়কি সত্তা নিয়ে বেলজিয়াম তথা বিশ্বমানচিত্রে নিজেদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে পোক্ত করার মরমী জীবনগাথা এভরিবডি ফেমাস। ক্ষমতা বুঝে এগিয়ে চললে অধরাকে ধরা যায় বিশ্বাসে বিশ্বাসী এভরিবডি ফেমাস।

এভরিবডি ফেমাস হোক কিংবা না হোক কথায় বলে বাংলাবাজার যাওয়া আসা না করলে দু-চার জোড়া জুতা ঠিকমতো ক্ষয় করতে না পারলে কবি- গল্পকার-ঔপন্যাসিক-নাট্যকার-প্রবন্ধকারের বিশাল মুক্ত আকাশের পরিধিটা ঠিকমতো বোঝা হয়ে ওঠে না।

নবীন-প্রবীণ সাহিত্যিক মাত্রই মানেন যে বই বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে (টাইপ, কম্পোজ, প্রচ্ছদ, প্লেট, প্রেস, বাঁধাই প্রভৃতি) ফেব্রুয়ারির বইমেলার অগণিত শিশু-কিশোর-যুবক-বৃদ্ধ কিংবা কিশোরী-যুবতী- বৃদ্ধাদের সম্মুখে নিজের মানও গুণ নিয়ে প্রকাশিত হবে, সেই বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রকাশকের কাছে জমা দেয়ার মোক্ষম সময় বছরের সেপ্টেম্বর মাস।

একদম প্রতিষ্ঠিত না হলে বর্ডার লাইন অক্টোবর। নভেম্বরে পাণ্ডুলিপি হাতে পেয়ে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পাঠক-পাঠিকার হাতে বই তুলে দিতে গেলে প্রকাশক- প্রকাশিকাদের যে কত বড় বাড়তি চাপ নিতে হয় তা বলে শেষ করার নয়।

কিন্তু ইউরোপের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ঘটনাটা ঘটে গেল উল্টো। সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাণ্ডুলিপি হাতে পেয়ে প্রকাশকদ্বয় যেটি বলতে চাইলেন সেটি মারাত্মক কষ্টকর। কিন্তু উৎসাহব্যঞ্জক। বলতে চাইলেন, পাকা রাধুনী হাঁড়ির একটি ভাত টিপে হাঁড়ির সব ভাতের অবস্থা বুঝে যায় সত্য কিন্তু গাঁ-গ্রাম কি শহর কোথাও আপনি শুধু বকনা বাছুর পাবেন না গাভী ছাড়া।

অর্থাৎ দু-একটা চলচ্চিত্রের সুবাদে সে দেশের চলচ্চিত্রের ধারা বুঝতে পারলেও সে দেশের চলচ্চিত্রের বেড়ে ওঠার পরিক্রমা সম্পর্কে জানার আগ্রহ পাঠক-পাঠিকার চিরকালের। পাণ্ডুলিপি এনলিস্টেড অবস্থায় রইলো, তিন মাস সময় দেয়া হলো অন্তত তিনটি দেশের চলচ্চিত্রের পরিক্রমা সম্পর্কে যতটা সম্ভব আইডিয়া পাঠক-পাঠিকাদের দেয়া যায়। সেই চেষ্টাটা শুরু করুন।

 

ভাবনায় অভাবনীয় ইউরোপের চলচ্চিত্র 

 

শুরু করার আগে যত রকমভাবে প্রকাশকদ্বয়ের প্রপোজাল ডিনাই করা যায় তার সব রকম ভেবেছি। ভেবেছি যে ইউরোপে আমি নিজে যাইনি সেই ইউরোপের কোনো একটি দেশের শতবর্ষের চলচ্চিত্র পরিক্রমা নিয়ে লিখতে যাওয়া বোকামি।

মনে করতে চেয়েছি প্রফেসর মনোজ মিত্র স্যারের সেই নির্দেশ, ‘যা তুমি দেখনি, যা তুমি ভাবতে পার না তা নিয়ে লিখতে যেও না। মনে পড়েছে ইরানি চলচ্চিত্র ‘হাফ ইডেনের’ একটি সংলাপ যেখানে তেহরানের এক প্রকাশক লেখিকাকে বলছেন, আপনি সবার কথা শুনবেন, আগের সব লেখা পড়বেন, যেখান থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তা গ্রহণ করবেন কিন্তু সবার উপরে বিশ্বাস রাখবেন নিজের দুজোড়া চোখের উপর।

তেমনিভাবে চোখের দেখা, মনের ভাবনার সাথে চলার পথে অর্জিত অভিজ্ঞতায় মিলেমিশে চলচ্চিত্র রিভিউ করা গেলেও চলচ্চিত্র পরিক্রমা নিয়ে লিখি কিভাবে? অপরদিকে এটাও ভেবেছি প্রকাশকদ্বয় যা চাচ্ছেন তার ভিত্তি কতটুকু। উত্তরও মিলেছে।

২০০৯ সালে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ থেকে প্রকাশিত ‘ইরানী চলচ্চিত্র’ বইটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে প্রকাশকদের। প্রকাশকদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার সুযোগ হলেও ‘ইরানী চলচ্চিত্র’ বইটি পাইয়ে দিয়েছে অনেক। সেই অনেকগুলো হলোঃ

  1. একটা বড় অংকের বই বিক্রি হয়েছে এবং বহুল পাঠক-পাঠিকা দ্বারা সমাদৃত হয়েছে।
  2. বাংলাদেশের ইরানি কাউন্সিল থেকে ‘ইরানী চলচ্চিত্র’ বইটি প্রদর্শিত হচ্ছে এবং বিক্রি হচ্ছে।
  3. যে আদর্শ এবং ভাবকে উপজীব্য করে ইরানিয়ান পরিচালকরা তাদের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন, রিভিউয়ের মধ্যে সেই ভাব ও আদর্শ আছে কিনা বিবেচনায় ইরান দেশের কালচারাল রিভিউ কমিটির রিভিউতে সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে।
  4. ২০ এবং ২১ মার্চ ২০০৯ সিলেট শাহজালাল ইউনিভার্সিটির চোখ ফিল্ম সোসাইটির আয়োজিত কর্মশালায় সিলেটের মেয়র বদরুল আহমদ কামরান সাহেবের উপস্থিতিতে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে একটা বড়সংখ্যক ইরানী চলচ্চিত্র বই তুলে দেয়া হয়েছে ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের হাতে। হাতে হাতে এত প্রাপ্তি পাওয়া গেল যে ইরানী চলচ্চিত্র বইটি লেখার সুবাদে সে তো এ কারণে যে প্রকাশকদ্বয় ইরানী চলচ্চিত্র বইটি করবেই করবে বলে শপথ করেছিল বলে ।

ইরানী চলচ্চিত্র বইটি যা যা পাইয়ে দিয়েছে একইভাবে ‘ইউরোপের চলচ্চিত্র’ও তাই তাই পাইয়ে দেবে ভেবে কাজটা করতে নেমে পড়লাম— ব্যাপারটা সে রকম না। ব্যাপার যেটি সেটি হলো ‘ইউরোপের চলচ্চিত্র’ বইটির সুবাধে প্রকাশক-লেখক-পাঠক আমরা তিন চাকার বিমান যে বিমানের কোনো একটি ঢাকা ছাড়া বিমানের পক্ষে টেক অফ কিংবা ল্যান্ড কোনোটি করাই সম্ভব নয়।

ফলে সবটাই সবার কাছে জানিয়ে রাখা এবং জেনে নেয়া জরুরি। যেমন যখন সিদ্ধান্ত নেয়াই হলো ইউরোপের পছন্দশীর্ষ তিনটি দেশের চলচ্চিত্র পরিক্রমা নিয়ে লেখা হবে তখন লেখার পূর্ব প্রস্তুতি ঠিক কি ছিল সেটা পাঠক-পাঠিকাকে সবিনয়ে জানাতেই হবে।

বিশ্ব চলচ্চিত্রের পরিক্রমায় নিও রিয়ালিজম মতবাদের জন্য ইতালির চলচ্চিত্র, নিউওয়েভ বা নবতরঙ্গ মতবাদের জন্য ফ্রান্সের চলচ্চিত্র এবং এক্সপ্রেশনিজম মতবাদের জন্য জার্মান চলচ্চিত্র বিশ্ব চলচ্চিত্রাকাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

ফলে ইউরোপের তিনটি দেশ বিবেচনা করতে গেলে ইতালি, ফ্রান্স এবং জার্মান সবার আগে পছন্দের শীর্ষে। কিন্তু ভেবে দেখলাম ইতালি, ফ্রান্স এবং জার্মান চলচ্চিত্র নিয়ে অনেক লেখা হাতের কাছে পাওয়া যায়। পাঠক-পাঠিকা নিজেরাও এ ব্যাপারে অনেকের থেকে অনেক কিছু বেশি জানেন।

ফলে বেশি রিপিটেশন না করে এই ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি ত্রি-অক্ষ থেকে শুধু জার্মানিকে সাথে নিয়ে অপর দুটি দেশ বাছা গেল বেলজিয়াম এবং চেক রিপাবলিক। বেলজিয়াম ছোট দেশ হলেও বেলজিয়ামের দুটি পরিচিতি আছে। একটি হলো বেলজিয়াম ইউরোপের রণক্ষেত্র আবার ইউরোপের ককপিট।

ঢাকায় ঢোকার মুখে ময়মনসিংহ যেমন ট্রানজিট রুট বেলজিয়ামের অবস্থাও অনেকটা সে রকম। ফলে বেলজিয়ামের চলচ্চিত্রের বেড়ে ওঠা জানা মানে সামগ্রিক ইউরোপের চলচ্চিত্রের গতিপ্রকৃতির শুরুর শুরুটার একটা আঁচ পাওয়া।

অপরদিকে অ্যাডলফ হিটলার যখন বুঝেই ফেললেন স্বপ্রচারের হাতিয়ার হিসেবে চলচ্চিত্র মাধ্যমের ব্যাপ্তি দিগন্তজোড়া, তখন তার প্রধান লক্ষ্য ছিল চেকস্লোভাকিয়ার আদর্শ এবং অনুকরণীয় ফিল্ম স্টুডিও বারান্দ্রারাম আয়ত্তে নেয়া।

চেক যখন স্লোভাক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চেক প্রজাতন্ত্র হয়ে গেল তখন দেখা গেল অস্কারের ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ফিল্ম ক্যাটাগরিতে অস্কার জয় করে নিয়ে যাচ্ছে চেক রিপাবলিক। ফলে পাতার আড়ালে রসালো লিচুর মতোই ইউরোপের মধ্যে থেকেও নিজেদের আড়ালে রেখেই চলচ্চিত্রের জয়গাঁথা নির্মাণ করছে এই চেক প্রজাতন্ত্র, এরা কারা।

নানা সীমাবদ্ধতাকে মাথায় রেখেই অবশেষে ডিঙ্গি নৌকা ভাসালাম জার্মানি, বেলিজয়াম এবং চেক রিপাবলিক চলচ্চিত্রাঙ্গনের মাঝ দরিয়ায়।মাঝ দরিয়ায় ডিঙ্গি ভাসালেও বৈঠা বাওয়ার শক্তি ইরানি চলচ্চিত্রের বেড়ে ওঠা আর্টিকেলটি লেখার অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতাঃ

  1. যে কোনো দেশের অ্যাম্বাসির পাবলিক রিলেশন অফিসারকে করণীয় কাজটা বুঝিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চাইলে তারা সহৃদয়ের সাথে সহযোগিতা করেন। সহযোগিতা চেয়ে সহযোগিতা পাওয়া গেল ।
  2. ইন্টারনেটে গুগল ওয়েসাইটে বসে আরাধ্য দেশের নামের সাথে ফিল্ম হিস্ট্রি বসালে অসংখ্য লেখা মনিটরে ভেসে ওঠে। যেমন— চেক ফিল্ম হিস্ট্রি নাম বসানো হলো, লেখা পাওয়া গেল । যাচাই বাছাই শেষে সারাংশ করা হলো।
  3. ইউরোপ চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট যত লেখা যত প্রকাশিত বই হাতের নাগালে পাওয়া গেল যতদূর সম্ভব তা সব পড়ে নেয়া হলো।
  4. দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য যত চলচ্চিত্র হাতের কাছে যোগাড় করা গেল তা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত দেখা হলো। ইতিহাস অপেক্ষা কাহিনী বা গল্প যে মানুষের মনের মধ্যে গেঁথে থাকে সেটা সর্বজনীন। যেমন- বাংলাদেশের যে কোনো মানুষই বলে দেন ছুটির ঘণ্টা চলচ্চিত্রে মূল বিষয় স্কুল ছুটির শেষে আটকাপড়া এক শিশুর মর্মান্তিক পরিণতির কথা।

হয়তো তাদের ভাবনার দরকার পড়ে না এই চলচ্চিত্রটি নিউওয়েভ না নিউরিয়ালিজম ভাবধারার কিংবা পরিচালকের নাম কি অথবা মায়ের চোখের জল বিগক্লোজ শটে না ধরে মিড ক্লোজশটে কেন ধরলো। ফলে তিনটি দেশের চলচ্চিত্রের বেড়ে ওঠার আর্টকেলগুলোতে বেশকিছু চলচ্চিত্রের কাহিনী পাঠক-পাঠিকা পেয়ে যাবেন বলেই বিশ্বাস ।

চলচ্চিত্রকে বিশ্বাস করে চলচ্চিত্রকে ভালোবেসে জীবনের একটা বড় সময় ধরে চলচ্চিত্রবিষয়ক লেখালেখির মধ্য দিয়ে পাঠক-পাঠিকাদের মনের চাহিদা হৃদয়ের তৃপ্তি পূরণ করে চলেছেন অনুপম হায়াৎ সাহেব।

বাংলাদেশের ইতিহাসে মিশে আছে যেমন অনুপম হায়াৎ রচিত ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস’ বইটি তেমনি বর্তমান প্রজন্মের চলচ্চিত্রের ছাত্রছাত্রীদের স্ক্রিপ্ট রাইটিং থেকে শুরু করে পোস্ট প্রডাকশন পর্যন্ত প্রতিটি বিভাগে সহযোগিতা করে চলছে তারই বই “চলচ্চিত্রবিদ্যা।

খুবই সীমিত কিন্তু চমৎকার সারাংশ নিয়ে অন্যান্য দেশের পাশাপাশি ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের চলচ্চিত্র পরিক্রমা রয়েছে তাঁর ‘চলচ্চিত্রবিদ্যা’ বইটিতে। পাথরের মতো শক্ত পদার্থকে তরমুজের মতো মিষ্টি ফলে রূপান্তরিত করার মতো সক্ষম লেখক পশ্চিম বাংলার রজত রায়।

‘চলচ্চিত্রের স্রষ্টারা” নামের তার বইটির প্রথম খণ্ড পড়তে পড়তে দ্বিতীয় খণ্ডটি সংগ্রহ করতে না পেয়ে শুধু মন ভারাক্রান্তই হয়েছে। রজত রায়ের ‘চলচ্চিত্রের স্রষ্টা’ বইটি যারাই পড়বেন তারাই জেনে যাবেন চলচ্চিত্রবিষয়ক লেখাও কবিতা গল্প উপন্যাসের মতো সহজপাঠ্য এবং আরামদায়ক উপভোগের বিষয়।

নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত সম্পাদিত ‘শতবর্ষে চলচ্চিত্র’ বইটিতে ইউরোপসহ সমস্ত বিশ্বের চলচ্চিত্র নিয়ে অনেক লেখা আছে। সোমেন ঘোষ রচিত ‘চলচ্চিত্রের ঘর বাহির’ বইটিতে চলচ্চিত্রের সব বিভাগের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের যত মতবাদ যেমন নিওরিয়ালিজম, ফ্রি সিনেমা প্রভৃতির মনোমুগ্ধকর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

এসব বই যেমন পড়া হলো তেমনি ওরাল বিসিএস গাইডের আন্তর্জাতিক বিভাগের মতো আরো যেসব বইতে ইউরোপ ছুঁয়ে যা কিছু যখন যেমন পাওয়া গেছে তা পড়ে নেয়া হয়েছে। পত্রিকা, ম্যাগাজিন যখন যেটা পাওয়া গেছে সেটাতেই চোখ রাখা হয়েছে, মনোযোগ দেয়া হয়েছে।

যোগ বিয়োগ গুণ ভাগের এ হিসাবের সময় অনেকে মনে করে যে উপকার করে সে বোকা। কিন্তু কথাটা যে বলে সে অনেক দেরিতে বোঝে আসলে সেই বোকা। কে না জানে যে গাভী দুধ দেয় তার নিচে সবাই বালতি পাতায়। উপকার করতে পারাটাই বর্তমান সময়ে সব থেকে বড় সক্ষমতা। এই যে প্রতিদিন কোটি কোটি ইউজার গুগল ওয়েবসাইটে সার্চ দেয় সে তো এ কারণে যে, যে কোনো

অজানা তথ্যের সন্ধান দেয়ার সক্ষমতা রাখে গুগল। এই লেখালেখির চলার পথে কত মানুষের কত উপকার যে পাচ্ছি তা লিখে শেষ করার নয়। জাতীয় দৈনিকগুলোতে লেখার সুবাদে সংবাদ, ডেস্টিনি, যায়াযায়দিন, সমকালের নানান জনের কাছে নানাভাবে কৃতজ্ঞ।

বে ইউরোপের চলচ্চিত্র লেখার প্রসঙ্গে যায়যায়দিনের সম্পাদকীয় বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল বিভাগ, সংস্কৃতি-বিনোদন বিভাগ এবং প্রুফ বিভাগের কাছে সবিশেষ কৃতজ্ঞ। বিদেশী বাক্যের সাবলীল বাংলা করার ক্ষেত্রে গতবারের মতো এবারও সহযোগিতা করেছে জুনিয়র নটরডেমিয়ান কিন্তু বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার স্টুডেন্ট সেই সৌরভ ঘণ্ট নাটক রিভিউ করার সুবাদে পরিচিত মানুষ নাট্যকর্মী শ্রাবণ ভাই।

সুকুমার রায়ের অবাক জলপান নাটকে তার চরিত্র ছিল আম জাম কাঁঠাল কলার ফেরিওয়ালা । মাথায় ঝুড়ি নিয়ে দীর্ঘ পথ, জায়গায় দাঁড়িয়ে হেঁটে বোঝাতে পারায় ভালো লেগেছিল। ইউরোপ চলচ্চিত্র লেখার সময় তার উপস্থিতি অনেকটা সেই ফেরিওয়ালার মতো, যার একহাত আমাকে ধরে টেনে নিয়ে চলছে অপর হাত শক্ত করে ঝুড়ি ধরা, যে ঝুড়িতে পরম যত্নে ইউরোপের চলচ্চিত্র বইটি তুলে নেয়ার তীব্র ব্যাকুলতা।

ব্যাকুল হৃদয়ের কথা ভুলি কিভাবে। তেমন একজন ব্যাকুল মানুষ আমার মনির ভাই (মনিরুল হক)। ভিনদেশী চলচ্চিত্র প্রথম খণ্ডের সুবাদে অনেকেই তাকে চেনেন। একাডেমী ফিল্ম সোসাইটির মেইনটেনেন্স এবং ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্বে থাকা মনির ভাই। যেদিন আমেরিকান অন্ধগায়ক ‘রে’- এর জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্রের রিভিউ নিয়ে তাকে দেখাই তিনি খুশি হলেন।

এক কাপ চা খাওয়ালেন। খাওয়া শেষে বললেন, আপনি আর কোন লেখা আমাকে দেখাবেন না। চলচ্চিত্র রিভিউ নিয়ে যেদিন বই বেরোবে সেদিন আমি পড়বো। এই মুহূর্ত থেকে সেই ভাবী বইয়ের অপেক্ষায় রইলাম। বই বেরোলো। বই নিয়ে তাকে দিলাম। তিনি নিলেন না। বললেন, একজন দিনমজুর দিন শেষে খাটুনির পারিশ্রমিক পেয়ে যায়। আপনারা লেখকরা পান বড় দেরিতে।

ভাই বলেন বন্ধু বলেন সৌজন্য কপি নিয়ে আপনাকে ঠকাতে পারব না। বইমেলা থেকে পঁচিশ পার্সেন্ট ডিসকাউন্টে নগদ দামে কিনে নেব। সেভাবেই তিনি কিনছেন। বই পড়েছি অনেক কিন্তু বইয়ের লেখক হওয়ার ভাবনা একান্তই মনির ভাইয়ের।

তাই এবার যখন সব পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকের কাছে যাবো যাবো ভাব তখন মনির ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম, আরো বেশি দেশের চলচ্চিত্র নিয়ে, আরো বেশি চলচ্চিত্রের পরিক্রমা নিয়ে, আরো বেশি সঠিক করে বইটি লিখে পাঠক- পাঠিকাদের হাতে পৌঁছে দিলে হতো না।

 

ভাবনায় অভাবনীয় ইউরোপের চলচ্চিত্র 

 

প্রতিউত্তরে বাংলাদেশের গায়ক জেমসের গাওয়া গানের বলিউড চলচ্চিত্র ‘লাইফ ইন মেট্রো’-এর একটা দৃশ্যের কথা বললেন। এক বন্ধু অপর বন্ধুকে বলছে, তুই যে নতুন গাড়িটি কিনলি সেটি কোথায়? উত্তর : চার বছর ধরে গ্যারেজে। প্রশ্ন কেন?

উত্তর যেদিন বোম্বে শহরে সব সিগন্যাল সবুজ থাকবে, কোথাও কোনো সার্জেন্ট থাকবে না সেদিন গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করবো। তখন বন্ধুটি বললো, সিগনাল সবুজ না লাল, সার্জেন্ট আছে কি নেই সেসবই বোঝা যাবে আর তার জন্য প্রথমে দরকার গ্যারেজ থেকে গাড়ি ড্রাইভ করে বেরিয়ে পড়া। লাইফ ইন মেট্রো চলচ্চিত্রটির বন্ধুর কথার সাথে সহমত হয়েই বেরিয়ে পড়া—ইউরোপের চলচ্চিত্র।

Leave a Comment