শচীন দেববর্মণ একজন বাঙ্গালি সংগীত শিল্পী। জন্ম ত্রিপুরায়, রাজ পরিবারের সন্তান, পিতা নবদ্বীপচন্দ্র ছিলেন বিখ্যাত সেতার বাদক। সংগীত শিক্ষায় হাতেখড়ি পিতার কাছে। পরে বাড়ির কাজের লোক মাধব ও আনোয়ার-এর কাছে লোক সংগীতের শিক্ষা। বাদল খাঁ, শ্যামলাল ক্ষেত্রী, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছেও সংগীত শিক্ষা নিয়েছিলেন।

শচীন দেববর্মণ
প্রথাগত শিক্ষা শুরু কুমিল্লায় ইউসুফ স্কুলে। ১৯২০ সালে কুমিল্লা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ১৯২২ সালে আই.এ. পাস করেন এবং ১৯২৪ সালে বি.এ. পাস করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ. পড়তে ভর্তি হন। শিক্ষা অসমাপ্ত রেখেই কৃষ্ণচন্দ্র দে-র কাছে সংগীত শিক্ষা শুরু করেন।
১৯৩২ সালে তাঁর সুরে এবং কণ্ঠে রেকর্ড প্রকাশিত হয় হিন্দুস্থান রেকর্ড থেকে। গান দুটির গীতিকার ছিলেন প্রণব রায়।
১৯৩৫ সালে কালী ফিল্মস প্রযোজিত খণ্ডচিত্র সাঁঝের প্রদীপত্র তিনি সংগীত পরিচালনার সাথে গানও গেয়েছিলেন।
পরবর্তী ছবি ইষ্ট ইন্ডিয়া ফিল্মস প্রযোজিত এবং ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত বিদ্রোহী (১৯৩৫)। এই ছবির সংগীত পরিচালনা করেন কৃষ্ণচন্দ্র দে। এই ছবিতে তিনি চারণের ভূমিকায় অভিনয়ের সাথে গানও গেয়েছিলেন। এই বছরই কালী ফিল্মস প্রযোজিত সুদূরের প্রিয়া নামক খণ্ডচিত্রটি পরিচালনার সাথে গানও করেন।

১৯৩৭ সালে সুকুমার দাশগুপ্ত পরিচালিত রাজগী ছবিতে তিনি গান করেন ভীষ্মদের চট্টোপাধ্যায়ের সংগীত পরিচালনায়। ১৯৩৯ সালে হরি ভঞ্জ পরিচালিত যখের ধন, ১৯৪০ সালে হীরেন বসু পরিচালিত অমরগীতি এবং সুকুমার দাশগুপ্ত পরিচালিত রাজকুমারের নির্বাসন ছবিতে তিনি যৌথ ভাবে সংগীত পরিচালনা করেন যথাক্রমে ধীরেন দাস, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় এবং হরিপ্রসন্ন দাসের সাথে।
ফিল্ম কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া প্রযোজিত এবং সুশীল মজুমদার পরিচালিত প্রতিশোধ (১৯৪১) ছবিতে তিনি স্বাধীন ভাবে সংগীত পরিচালনা করার সুযোগ পান। অজয় ভট্টাচার্য পরিচালিত অশোক (১৯৪২) এবং ছদ্মবেশী (১৯৪৪) ছবি দুটিতে তিনি সংগীত পরিচালনা করেন। এর মধ্যে ছদ্মবেশীর সংগীতাংশ জনপ্রিয় হয়েছিল।
জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত মিলন (১৯৪২), কলঙ্কিনী (১৯৪৫), ছবি বিশ্বাস পরিচালিত প্রতিকার (১৯৪৪), হরি ভঞ্জ পরিচালিত মাটির ঘর (১৯৪৪), কালীপ্রসাদ ঘোষ পরিচালিত জজ সাহেবের নাতনী (১৯৪৩) ছবিগুলিতেও সংগীত পরিচালক হিসাবে কাজ করেন।

১৯৪৪ সালে তিনি বোম্বে চলে যান এবং হিন্দী ছবির জগতে সংগীত পরিচালক হিসাবে সর্বভারতীয় পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তী কালে মাত্র দুটি বাংলা ছবিতে তিনি সংগীত পরিচালক এবং গায়ক হিসাবে কাজ করেন, সেগুলি হল বোম্বে টকীজ প্রযোজিত এবং নীতিন বসু পরিচালিত সমর (১৯৫০) এবং অপরেশ লাহিড়ী প্রযোজিত ও আমার দেশের মাটি (১৯৫৮)।
বোম্বেতে তিনি বহু বাণিজ্যসফল ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন এবং তাঁর করা সংগীত জনপ্রিয়তার শিখর স্পর্শ করেছে। ১৯৫৩ সালে ট্যাক্সি ড্রাইভার ছবির জন্য এবং ১৯৭৪ সালে অভিমান ছবির জন্য পান ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার, পিয়াসা ছবির জন্য ১৯৫৯ সালে এশিয়াড ফিল্ম সোসাইটি পুরস্কার।
১৯৫৮ সালে সংগীত নাটক আকাদেমির পুরস্কার লাভ এবং ১৯৬৪ সালে ক্যায়সে কতুর জন্য সত্ত হরিদাস পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৬৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী দিয়ে সম্মান জানায়। তাঁর শেষ হিন্দী ছবি মিলি। ১৯৭৫ সালে তাঁর জীবনাবসান হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক রাহুল দেববর্মণ তাঁর পুত্র।
চলচ্চিত্রপঞ্জি—
- ১৯৩৫ সাঁঝের প্রদীপ বিদ্রোহী’,
- ১৯৩৭ রাজগী’,
- ১৯৩৯ যথের ধন,
- ১৯৪০ অমরগীতি:
- ১৯৪১ প্রতিশোধ’,
- ১৯৪২ মিলন, অশোক;
- ১৯৪৩ জজ সাহেবের নাতনী,
- ১৯৪৪ ছদ্মবেশী, মাটির ঘর, প্রতিকার
- ১৯৪৫ কলঙ্কিনী,
- ১৯৪৬ মাতৃহারা,
- ১৯৫০ সমর:
- ১৯৫৮ ও আমার দেশের মাটি।
