সত্যজিৎ রায় এর জন্ম ২রা মে ১৯২১ কলকাতার গড়পারে। পিতা সুকুমার রায় এবং পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। অল্প বয়সে পিতার মৃত্যু হয়। গড়পার থেকে চলে আসেন মামার বাড়ি বকুলবাগানে। ১৯৩৬ সালে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪০ সালে অর্থনীতিতে অনার্স নিয়ে বি.এ পাস করেন, ঐ বছরই শান্তিনিকেতন কলাভবনে ভর্তি হন। কবিগুরুর মৃত্যুর পর ১৯৪২ সালে শিক্ষা অসমাপ্ত রেখেই কলকাতায় ফিরে আসেন।
সত্যজিৎ রায়

সত্যজিৎ রায় ১৯৪৩ সালে ডি জে কিমার নামক বিজ্ঞাপন সংস্থায় ভিসুয়ালাইজার পদে যোগ দেন। দিলীপ কুমার গুপ্ত প্রতিষ্ঠিত সিগনেট প্রেস-এ বইয়ের প্রচ্ছদ এবং অলংকরণের কাজের সাথেও যুক্ত হন। ঝিন্দের বন্দী, বিলাসমন ইত্যাদি প্রথম দিককার চিত্রনাট্যগুলি এই সময়েই লেখা।
১৯৪৬ সালে রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে উপন্যাসের চিত্রনাট্য রচনা করেন, ঠিক ছিল ছবি পরিচালনা করবেন হরিসাধন দাশগুপ্ত। ১৯৪৭ সালে চিদানন্দ দাশগুপ্ত, হরিসাধন দাশগুপ্ত, রাম হালদার, বংশী চন্দ্রগুপ্তের সাথে করেন কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি। সত্যজিতের করা বিজ্ঞাপন চিত্র এ পারফেক্ট ডে’র চিত্রনাট্য অবলম্বনে ছবি তৈরি হয়, পরিচালনা করেন। হরিসাধন দাশগুপ্ত। ১৯৪৮এ বিজয়া রায়ের সাথে বিয়ে হয়।

১৯৫০এ ‘দি রিভার’ ছবি তৈরি করার জন্য ফরাসি চিত্রপরিচালক ঈ রেনোয়া কলকাতায় আসেন, তাঁর কাজের সাথে পরিচয় হয়। ডি জে কিমারও আর্ট ডিরেক্টার পদে উন্নীত হন এবং ৬ মাসের জন্য সস্ত্রীক ইউরোপ যান। লন্ডনে তিনি ফিল্ম ক্লাবের সদস্য হিসাবে চার মাসে অনেকগুলি ছবি দেখার সুযোগ পান।
ইউরোপ থেকে ফেরার পথে জাহাজে তিনি পথের পাঁচালী’ ছবির চিত্রনাটার খসড়া তৈরি করেন। সিগনেট প্রেস প্রকাশিত পথের পাঁচালীর কিশোর সংস্করণ ‘আম আঁটির ভেঁপু’ গ্রন্থের জন্য ছবি আঁকার সূত্রে তিনি এই গ্রন্থ নিয়ে ছবি করার কথা ভাবেন। ১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে এই ছবির চিত্রগ্রহণের কাজ শুরু হয়।
মূলত অর্থাভাবের কারণে ছবি তৈরিতে বাধা পড়ে, শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকার ছবি প্রযোজনার দায়িত্ব নেন। ১৯৫৫ সালে ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন। ছবিটি দেশে ও বিদেশে পুরস্কৃত হয়। ১৯৫৬ সালে পথের পাঁচালী কান চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ মানবিক আবেদন সম্পন্ন ছবি হিসাবে সম্মান লাভ করে।
সমগ্র চলচ্চিত্র জীবনে তিনি ২৮টি কাহিনিচিত্র, ৫টি তথ্যচিত্র এবং ৩টি টেলিভিশন চিত্র নির্মাণ করেন। তার সবগুলি ছবির চিত্রনাট্য তিনি নিজেই রচনা করেছিলেন। তাঁর ৭ম ছবি (তিনকন্যা, ১৯৬১) থেকে ছবির সংগীত পরিচালনার দায়িত্বও নিজেই নিয়েছিলেন, ছবির প্রয়োজনে গানও লিখেছেন। প্রথম লেখা গান দেবী (১৯৬০) ছবির জন্য একটি শ্যামা সংগীত।

অন্যের লেখা গল্প উপন্যাসের পাশাপাশি নিজের মৌলিক চিত্রনাট্য অবলম্বনে কাঞ্চনজত্বা (১৯৬২) এবং নায়ক (১৯৬৬) ছবি ছাড়াও নিজের লেখা ফেলুদা কাহিনি অবলম্বনে ২টি ছবি (সোনার কেল্লা, ১৯৭৪, এবং জয় বাবা ফেলুনাথ, ১৯৭৮) এবং নিজের গল্প অবলম্বনে ৩টি ছবি (হীরক রাজার দেশে, ১৯৮০, শাখাপ্রশাখা, ১৯৯০ এবং আগন্তুক, ১৯৯১) নির্মাণ করেন।
নিজের ছবি ছাড়াও তিনি অন্য পরিচালকদের ছবির জন্য সংগীত পরিচালনা, চিত্রনাট্য রচনা, ধারাভাষ্য পাঠ-এর কাজও পুত্র সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় নির্মিত ফটিকচাদ (১৯৮৩), গুপী বাঘা ফিরে এলো (১৯৯২) এবং উত্তরণ (১৯৯৪) তাঁর লেখা কাহিনি অবলম্বনে তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে ফটিকচাদ ও উত্তরণ ছবির চিত্রনাট্য ও সংগীত তিনি করেছিলেন। এছাড়াও নিত্যানন্দ দত্ত পরিচালিত বাক্সবদল (১৯৬৫) ছবির চিত্রনাট্য ও সংগীত পরিচালনা করেন সত্যজিৎ রায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে নিজের ছবির মুক্তির জন্য বিজ্ঞাপনের খসড়াও তিনি নিজেই করতেন।
চিত্র পরিচালনার সাথে সাথে সাহিত্য রচনাও করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য উপেন্দ্রকিশোর প্রতিষ্ঠিত সন্দেশ পত্রিকা সম্পাদনার কাজ এক সময় তাঁর পিতা সুকুমার রায় কাঁধে তুলে নেন, সুকুমারের আকস্মিক মৃত্যুতে পত্রিকা প্রকাশনায় ছেদ পড়ে।
১৯৬১ সালে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সাথে সত্যজিতের যুগ্ম সম্পাদনায় সন্দেশ পত্রিকা নবপর্যায়ে প্রকাশিত হতে শুরু করে। ছোটদের এই পত্রিকার প্রয়োজনে সাহিত্যিক সত্যজিতের আবির্ভাব। গোয়েন্দা সাহিত্যে সত্যজিতের সৃষ্ট ‘ফেলুদা’, বিশেষ করে ‘জটায়ু’ চরিত্রটি তাঁর অনন্য সৃষ্টি হিসাবে চিহ্নিত। কা বিজ্ঞানে ‘প্রফেসার শঙ্কু’ একটি অনবদ্য চরিত্র হিসাবে পরিগণিত হয়।

ফেলুদা বা শম্ভু কাহিনি ছাড়াও তাঁর গল্প বা অনুবাদগুলিও উল্লেখের দাবি রাখে। অনেক ক্ষেত্রেই এই গল্প উপন্যাসের অলঙ্করণও তিনি নিজেই করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় তাঁর লেখা চিত্রনাট্য, গল্প, উপন্যাস বিভিন্ন দেশি বিদেশি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ইংরাজি ছাড়াও জাপানী, জর্মন, পোলিশ, ফরাসি, স্প্যানিশ, হিন্দী, ওড়িয়া, গুজরাটী, তামিল, তেলুগু, মারাঠী ও মালয়ালম ভাষায় তাঁর বিভিন্ন রচনা অনুদিত হয়েছে।
সাহিত্য সৃষ্টি ছাড়াও চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রবন্ধ এবং গ্রন্থ রচনাও করেছেন, পাশাপাশি আত্মজীবনী মূলক ‘যখন ছোট ছিলাম’ বা ‘অপুর পাঁচালী’ও লেখক সত্যজিৎকে প্রশংসা এনে দিয়েছে।
কলকাতা বেতারের জন্য পাশ্চাত্য সংগীত, বিঠোভেন, মোৎসার্ট, রবীন্দ্রনাথের উপর বুলবুল সরকারের নেওয়া ইন্টারভিউগুলিতে, এবং টেকনিসিয়ান স্টুডিওতে উত্তমকুমারের স্মৃতি সভায় তাঁর দেওয়া ভাষণে বা অমল ভট্টাচার্য স্মৃতি বক্তৃতায় আমরা সত্যজিতের অসামান্য বাগ্মীতার পরিচয় পাই। নিজের পরিচালনায় তৈরি তথ্যচিত্রগুলির ইংরাজি সংস্করণের ধারাভাষ্য তিনি নিজেই দিয়েছিলেন।
পরিচালিত ছবিগুলির জন্য বহু জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কারের পাশাপাশি ভারত সরকার, অন্যান্য কয়েকটি দেশের সরকার এবং বহু জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তাঁকে নানা পুরস্কারে এবং সম্মানে ভূষিত করেছে। ১৯৮৪ সালে তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত হন। দেশে এবং বিদেশে বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে বিচারক এবং বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন। বহু বিশ্ববিদ্যালয় (দেশে এবং বিদেশে) তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট বা ডি. লিট উপাধি প্রদান করেছে। দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন শহরে তাঁকে নাগরিক সম্বর্ধনা জানানো হয়।
ভারত সরকার ১৯৫৮ সালে পদ্মশ্রী, ১৯৬৫ সালে পদ্মভূষণ, ১৯৭৬ সালে পদ্মবিভূষণ ও ১৯৯২ সালে ভারতরত্ন পুরস্কারে ভূষিত করে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ঐ মিতের তাকে ঐ দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘লিজিয়ন দ্য অনার’ এ ভূষিত করেন। ১৯৯২ সালে নিউইয়র্কের অ্যাকাডেমি অফ মোশন পিকচার্স তাকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্টের জন্য অস্কার প্রদান করে।
চলচ্চিত্রপঞ্জি—
- পথের পাঁচালী (১৯৫৫),
- অপরাজিত (১৯৫৬),
- পরশপাথর (১৯৫৭),
- জলসাঘর (১৯৫৮),
- অপুর সংসার (১৯৫৯)
- দেবী (১৯৬০),
- তিনকন্যা (১৯৬১),
- রবীন্দ্রনাথ (তথ্যচিত্র, ১৯৬১),
- কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৬২),
- অভিযান (১৯৬২),
- মহানগর (১৯৬৩),
- চারুলতা (১৯৬৪),
- টু (দূরদর্শন চিত্র, ১৯৬৪),
- কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫),
- নায়ক (১৯৬৬),
- চিড়িয়াখানা (১৯৬৭),
- গুপী গাইন ও বাঘা বাইন (১৯৬৯),
- অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৭০),
- প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০),
- সীমাবদ্ধ (১৯৭১),
- সিকিম (তথ্যচিত্র, ১৯৭১),
- অশনি সংকেত (১৯৭৩),
- সোনার কেল্লা (১৯৭৪),
- দ্য ইনার আই (তথ্যচিত্র, ১৯৭৪),
- জনঅরণ্য (১৯৭৫),
- বালা (তথ্যচিত্র, ১৯৭৬),
- শতরঞ্জ কি খিলাড়ী (উর্দু/ইংরাজি, ১৯৭৭),
- জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৮),
- হীরক রাজার দেশে (১৯৮০),
- পিকু (দূরদর্শন চিত্র, ১৯৮২),
- সদগতি (দূরদর্শন চিত্র, ১৯৮২),
- ঘরে বাইরে (১৯৮৪),
- সুকুমার রায় (তথ্যচিত্র, ১৯৮৭),
- গণশত্রু (১৯৮৯),
- শাখাপ্রশাখা (১৯৯০),
- আগন্তুক (১৯৯১)।
নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি
- দিলীপকুমার ভট্টাচার্য —জীবনশিল্পী সত্যজিৎ রায়। কলকাতা, হরফ, ১৯৬৯।
- শীতলচন্দ্র ঘোষ ও অরুণকুমার রায় সম্পাদিত – সত্যজিৎ রায় ভিন্ন চোখে। কলকাতা, ভারতী, ১৯৮০।
- অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়— চলচ্চিত্র, সমাজ ও সত্যজিৎ রায়। আসানসোল, ফিল্ম স্টাডি সেন্টার, ১৯৮০।
- দিলীপ মুখোপাধ্যায় – সত্যজিৎ। কলকাতা, বাণীশিল্প, ১৯৮৬।
- সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত – সত্যজিৎ জীবন ও শিল্প কলকাতা, প্রতিভাস, ১৯৯৬।
Marie Seton. Portrait of a Director Satyajit Ray London. Dennis Dobson, 1971 Robin Wood The Apu Trilogy London. Praeger Film Library, 1971 Chidananda Dasgupta. The Cinema of Satyajit Ray N.D. Vikas, 1980 Ben Nyce Satyajit Ray A Study of His Film NY Praeger, 1988 Andrew Robinson. Satyajit Ray The Inner Eye. London, Andre Deutsch. 1989
বি.দ্র. সত্যজিৎ বিষয়ক ৫০টি বাংলা, ১৬টি ইংরাজি এবং ৯টি দেশি ও বিদেশি ভাষায় ১৬টি গ্রন্থ, বিভিন্ন পত্রিকার ৭০টি বাংলা ও ইংরাজি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে এবং ১৫টি তথ্যচিত্র এবং টেলিভিশন চিত্র নির্মিত হয়েছে।
