রাজেন তরফদার, জন্ম পূর্ববঙ্গের রাজশাহীতে (অধুনা বাংলাদেশে)। স্কুলশিক্ষা রাজশাহীতে। ছোটবেলায় পাড়ার নাট্যাভিনয়ে অংশ নিয়েছেন। পরবর্তী কালে চাকুরি জীবনেও নাটকে অভিনয় করেছেন। অঙ্কন শিক্ষা কলকাতায়, ১৯৪০ সালে কলকাতা আর্ট স্কুল থেকে অঙ্কনে স্নাতক হন। কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হিসাবে কাজ শুরু করেন জে ওয়াল্টার টমসন কোম্পানিতে। ১৯৪৪-৫৮ পর্যন্ত চাকরি করেন। কর্মক্ষেত্রে চীফ আর্ট ডিরেক্টার পদে উন্নীত হয়েছিলেন।

রাজেন তরফদার । বাঙালি চলচ্চিত্র অভিনেতা
১৯৫১ সালে জাঁ রেনোয়ার দি রিভার ছবির শুটিং আরও অনেকের মতো তাঁকেও চলচ্চিত্রের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। পরবর্তী কালে কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি, কলকাতার প্রথম চলচ্চিত্র উৎসব, ইটালিয়ান নিও রিয়ালিজম ইত্যাদি তাকে চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করে। সং চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার কারণে চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্রতী হন।
প্রথম ছবি তুলসী লাহিড়ীর কাহিনি অবলম্বনে অন্তরীক্ষ (১৯৫৭) অন্য ধারার পরিচালক হিসাবে তাঁকে পরিচিতি এনে দেয়। তৎকালীন চলচ্চিত্র সমালোচকরাও ছবিটির প্রশংসা করেছিলেন।

পরবর্তী ছবি সমরেশ বসুর কাহিনি অবলম্বনে গঙ্গা (১৯৬০)। এই ছবিতে তিনি জেলেদের দৈনন্দিন জীবন সংগ্রাম, তাদের ধর্মীয় আচার, সামাজিক রীতিনীতি চিত্রায়ণে তথ্যচিত্রের ধাঁচ বজায় রেখে কাহিনি বিন্যাস করেছেন। চলচ্চিত্রের বাস্তবমুখী ধারাকে অক্ষুণ্ণ রেখে এই সম্প্রদায়ের মানুষদের পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছেন। মহাশ্বেতা দেবীর কাহিনি অবলম্বনে অগ্নিশিখা (১৯৬২) এবং আকাশ ছোঁয়া (১৯৬৭) ছবি দুটিও ব্যতিক্রমী ও সৎ শিল্পী হিসাবে তাঁর পরিচয়কে আরও বিস্তৃত করে। মাঝখানে তিনি শক্তিপদ রাজগুরুর গল্প অবলম্বনে পরিচালনা করেন জীবন কাহিনী (১৯৬৪)।
পরের ছবি পালঙ্ক (১৯৭৫) তৈরি করেন নরেন্দ্রনাথ মিত্রের কাহিনি অবলম্বনে, দেশভাগ, পূর্ববঙ্গ এবং বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার পটভূমিকায় উপাত্ত মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা এবং একটি পালঙ্ককে কেন্দ্র করে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ এবং শেষে সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে ‘বাঙালী’ মুলাবোধের জয়গান।
শেষ ছবি নাগপাশ ১৯৮৭ সালে তৈরি করেন। সমগ্র চলচ্চিত্র জীবনে মাত্র সাতটি ছবি পরিচালনা করেছিলেন। অভিনয় করেছিলেন শেখর চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত বসুন্ধরা (১৯৮৬)। এবং মৃণাল সেনের আকালের সন্ধানে (১৯৮২) ছবিতে। এ ছাড়াও তরুণ মজুমদার পরিচালিত সংসার সীমান্তে (১৯৭৫) এবং গণদেবতা (১৯৭৯) ছবির চিত্রনাট্য যুগ্ম ভাবে রচনাও করেছিলেন। সৎ চলচ্চিত্রের প্রতি আজীবন দায়বদ্ধ থাকলেও রাজেন তরফদার তাঁর জীবদ্দশায় যথাযোগ্য মর্যাদা পান নি।
প্রকাশনা চিত্রভাষ—
রাজেন তরফদার সংখ্যা, ২৪ বর্ষ, ২য়- ৪র্থ সংখ্যা, এপ্রিল-ডিসেম্বর ১৯৮৯। বৈশাখী রাজেন তরফদার সংখ্যা, ২০১১ ২০১২।
চলচ্চিত্রপঞ্জি —
- ১৯৫৭ অস্তরীক্ষ:
- ১৯৬০ গঙ্গা
- ১৯৬২ অগ্নিশিখা,
- ১৯৬৪ জীবন কাহিনী:
- ১৯৬৭ আকাশ ছোঁয়া,
- ১৯৭৫ পালঙ্ক, সংসার সীমান্তে
- ১৯৭৯ গণদেবতা
- ১৯৮২ আকালের সন্ধানে (অভিনয়);
- ১৯৮৬ বসুন্ধরা (অভিনয়):
- ১৯৮৭ নাগপাশ।
