রাইচাঁদ বড়াল, জন্ম কলকাতায়। আদি ব্রাহ্মসমাজের সদস্য প্রেমচাদ বড়ালের পৌত্র এবং বিখ্যাত উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পী লালচাঁদ বড়ালের পুত্র। অল্পবয়সে পিতার মৃত্যু হয়। মাত্র দশ বছর বয়সে সংগীতশিল্পী গহরজানের গানের সাথে তবলা সংগতের সুযোগ পেয়েছিলেন। তবলা শিক্ষায় তাঁর গুরু মসিদ খাঁ। স্বনামধন্য তবলিয়া কেরামতউল্লা খাঁর পিতা মসীদুল্লা খাঁর কাছেও তবলা বাজানোর শিক্ষা পান।

রাইচাঁদ বড়াল
রাইচাদের পরিবারের প্রায় সকলেই সংগীতের সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯২৭ সালে ইণ্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি (বেতার কেন্দ্র) প্রতিষ্ঠিত হলে রাইচাদ ভারতীয় সংগীত বিভাগের সহ পরিচালক হিসাবে যোগ দেন। বেতার কেন্দ্রে কাজ করার সুবাদেই পঙ্কজ মল্লিকের সাথে ঘনিষ্ঠতা। নির্বাক ছবির যুগে পর্দায় ছবি চলাকালীন সংগীত শিল্পীরা ছবির দৃশ্যের সাথে সামজস্য রেখে সংগীত পরিবেশন করতেন।
ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ক্রাফট-এর প্রযোজনায় তৈরি চোরকাঁটা (১৯৩১) এবং চাষার মেয়ে (১৯৩১) ছবি দুটির সাথে তবলা বাজাবার জন্য সংগীত সৃষ্টি করেছিলেন রাইচাঁদ বড়াল এবং পঙ্কজকুমার মল্লিক। ছবি দুটির পরিচালক ছিলেন যথাক্রমে চারু রায় এবং প্রফুল্ল রায়।

১৯৩১ সালে নিউ থিয়েটার্স তৈরির সময় থেকেই রাইচাদ তার সাথে যুক্ত হন। N.T প্রযোজিত এবং প্রেমাঙ্কুর আতর্থী পরিচালিত দেনাপাওনা (১৯৩১) ছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন রাইচাঁদ। ১৯৩১ থেকে ১৯৩৩ পর্যন্ত নিউ থিয়েটার্স প্রযোজিত প্রায় সব বাংলা, হিন্দী ‘ও উর্দু ছবির সংগীত সৃষ্টি করেন।
ব্যতিক্রম ছিল রবীন্দ্রনাথ পরিচালিত নটীর পূজা (১৯৩২) এবং শিশির ভাদুড়ী পরিচালিত সীতা (১৯৩৩), নটীর পূজার সংগীতের দায়িত্বে ছিলেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সীতা-য় ছিলেন রাইচাদের ভাই বিষণচাদ। নিউ থিয়েটার্সের প্রথম বক্স অফিস সফল ছবি দেবকী বসু পরিচালিত চণ্ডীদাসের (১৯৩৩) সংগীত রাইচাদের।
মীরাবাই (১৯৩৩) ছবির সংগীতও খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। ১৯৩৪ সালে নির্মিত প্রথম কার্টুন ছবি পি ব্রাদার্স ছবির পরিচালনা ও সংগীত রাইচাদের। প্রথম প্লেব্যাক পদ্ধতির প্রয়োগ হয় ভাগ্যচক্র (১৯৩৫) এবং এর হিন্দী ধুপছাও ছবিতে এবং এর সংগীত সৃষ্টির দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। প্রমথেশ বড়ুয়া পরিচালিত দেবদাস (১৯৩৫) ছবির সংগীত পরিচালনা রাইচাদ যুগ্ম ভাবে করেছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিকের সাথে।

দেবকী বসু পরিচালিত বাংলা ও হিন্দী বিদ্যাপতি (১৯৩৮) ছবির সংগীতও তাঁর। এই ছবির “অঙ্গনে আওব জব রসিয়া” গানটি কানন দেবীকে খ্যাতির শীর্ষে তুলে দেয়। রাইচাঁদ ভারতীয় মার্গ সংগীতের পাশাপাশি, লোকসংগীত, কীর্তন এমনকী পাশ্চাত্য সংগীতের জগতেও স্বচ্ছন্দে বিচরণ করতে পারতেন।
তবলা বাদক পাশাপাশি তিনি পিয়ানো বাদনেও স্বচ্ছন্দ ছিলেন। সাথী (১৯৩৮) এবং এর হিন্দী ভার্সন টি সিঙ্গার (১৯৩৮) ছবিতে “বাবুল মোরা” গানের মধ্য দিয়ে উচ্চাঙ্গ সংগীতকেও প্রয়োগ কৌশলের জাদুতে যে জনপ্রিয় করা যায় সেটা প্রমাণ করলেন রাইটান। ১৯৩৯ সালে মুক্তি পায় তাঁর সংগীত পরিচালনায় সাপুড়ে এবং রজত জয়ন্তী। চলচ্চিত্রে রবীন্দ্র সংগীত প্রয়োগে তিনি স্বচ্ছন্দ নন এই ধারণাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করে পরিচয় (১৯৪১) ছবিতে তিনি নয়টি রবীন্দ্র সংগীত ব্যবহার করেন। এই ছবির গানগুলি দর্শক সমাদর লাভ করেছিল।
১৯৪১ সালে তিনি বোম্বে চলে যান। ১৯৪৩ সালে ফিরে এসে ওয়াপস (১৯৪৩, হিন্দী) ছবির সংগীত পরিচালনা করেন। পরবর্তী কালে বিমল রায় পরিচালিত উদয়ের পথে (১৯৪৪) এবং এর হিন্দী হামরাহী (১৯৪৫), বাংলা ও হিন্দী অঞ্জনগড় (১৯৪৮), মন্ত্রমুগ্ধ (১৯৪৯) ছবির সংগীত পরিচালনা করেন। নেতাজীর জীবনী অবলম্বনে বিমল রায় পরিচালিত পহেলা আদমী (১৯৫৩, হিন্দী) ছবির সংগীত পরিচালনা তিনি করেছিলেন।
অমর মল্লিক প্রোডাকসন্স-এর প্রথম ছবি স্বামীজী (১৯৪৯) ছবির সংগীত বাইচাদের দেওয়া। এই ছবিতে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গাওয়া “মন চল নিজ নিকেতনে” গানটি জনপ্রিয় হয়েছিল। ১৯৫১ সালে রাইচান বড়ালের প্রযোজনায় তৈরি হয় ভুলের শেষে। ১৯৫৯এ দেবকী বসু পরিচালিত সাগর সঙ্গমে ছবির সংগীত রাইচাদের, শেষ ছবি নতুন ফসল (১৯৬০) চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনায় তাঁর অসাধারণ অবদানকে সম্মান জানিয়ে ১৯৭৮ সালে তাঁকে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
চলচ্চিত্রপঞ্জি —
- ১৯৩১ দেনাপাওনা
- ১৯৩২ পুনর্জন্ম, চিরকুমার সভা, পল্লী সমাজ, চণ্ডীদাস,
- ১৯৩৩ কপালকুণ্ডলা, মাসতুতো ভাই, মীরাবাই:
- ১৯৩৪ এক্সকিউজ মী স্যার, রূপলেখা, পি. ব্রাদার্স,
- ১৯৩৫ দেবদাস, ভাগ্যচক্র,
- ১৯৩৬ গৃহদাহ, মায়া:
- ১৯৩৭ দিদি
- ১৯৩৮: বিদ্যাপতি, অভিজ্ঞান, সাথী:
- ১৯৩৯ সাপুড়ে, রজত জয়ন্তী
- ১৯৪০ অভিনেত্রী;
- ১৯৪১ পরিচয়, প্রতিশ্রুতি;
- ১৯৪২ নারী:
- ১৯৪৩ দাবী:
- ১৯৪৪ উদয়ের পথে
- ১৯৪৬ বিরাজ বৌ
- ১৯৪৮ অঞ্জনগড়,
- ১৯৪৯ মন্ত্রমুগ্ধ, স্বামীজী, বিষ্ণুপ্রিয়া,
- ১৯৫০ বড় বৌ,
- ১৯৫১ পরিত্রাণ, স্পর্শমণি,
- ১৯৫২ ভুলের শেষে
- ১৯৫৭ নীলাচলে মহাপ্রভু।
- ১৯৫৯ সাগর সঙ্গমে
- ১৯৬০ নতুন ফসল।
