মৃণাল সেন । বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক

মৃণাল সেন, জন্ম পূর্ববঙ্গের (অধুনা বাংলাদেশ) ফরিদপুরে। স্কুল শিক্ষা শুরু হয় সেখানেই। ফরিদপুরের ঈশান থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ১৯৩৮ সালে আই.এসসি. পড়ার জন্য রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন। এই সময়েই বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের (ছাত্র ফেডারেশন) সাথে যোগাযোগ ঘটে। ১৯৪০ সালে বি.এসসি পড়ার জন্য কলকাতায় আসেন। বি.এসসি পড়ার সময় নিয়মিত লাইব্রেরিতে (বর্তমানে ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার) পড়াশোনার সুবাদে চলচ্চিত্র বিষয়ক গ্রন্থ ও পত্রপত্রিকার প্রতি আকর্ষণ।

 

মৃণাল সেন । বাংলা চলচ্চিত্রের অভিধান

 

মৃণাল সেন । বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক

 

তাঁর লেখা চলচ্চিত্র সংক্রান্ত প্রথম প্রবন্ধ ‘দ্য ফিল্ম এ্যন্ড দ্য পিপল’ ১৯৪৫ সালে ইন্দো সোভিয়েত জার্নালে প্রকাশিত হয়। তাঁর করা ক্যারল চ্যাপেকের ‘চাট’ এর বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৪৬ সালে। এই সময়কালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সাথেও যোগাযোগ ঘটে।

চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রথম ব্যঙ্গ রচনা ‘আজবপুরী’ চিত্রবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় (কার্তিক ১৩৫৫)। কিছুদিন মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভ হিসাবে কাজ করলেও চলচ্চিত্রের আকর্ষণে চাকরি ছাড়েন। এই সময়ে তাঁর বংশী চন্দ্রগুপ্ত, হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়, ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায় প্রভৃতি চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের সাথে পরিচয় ঘটে।

বাংলা চলচ্চিত্রের সাথে তাঁর প্রথম যোগাযোগ কাহিনিকার হিসাবে। তাঁর কাহিনি অবলম্বনে দুধারা (১৯৫০) ছবিটি হয়। ছবিটি বক্স অফিসে ব্যর্থ হলেও এর কাহিনি প্রশংসিত হয়েছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই ছবিতে গীতা সেনের (গীতা সোম) প্রথম চলচ্চিত্রাভিনয় এবং পরবর্তী কালে (১৯৫৩) মৃণাল সেনের সাথে বিয়ে হয়। স্বাধীন পরিচালক হিসাবে প্রথম ছবি রাতভোর (১৯৫৫)।

 

মৃণাল সেন । বাংলা চলচ্চিত্রের অভিধান

 

পরবর্তী দুটি ছবি নীল আকাশের নীচে (১৯৫৯) এবং বাইশে শ্রাবণ (১৯৬০) তাকে ব্যতিক্রমী চিত্র পরিচালক হিসাবে পরিচিতি এনে দেয়। ৪র্থ ছবি পুনশ্চ (১৯৬১) আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত শ্রেষ্ঠ ছবি হিসাবে রাষ্ট্রপতির সার্টিফিকেট অফ মেরিট লাভ করে। প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ ফিল্মস ডিভিসন প্রযোজিত মুভিং পারসপেকটিভ (১৯৬৭) ছবির জন্য। ছবিটি নমপেন চলচ্চিত্র উৎসবে রৌপ্য পদক লাভ করে।

সমগ্র চলচ্চিত্র জীবনে বাংলা, হিন্দী, ওড়িয়া, বেলুত প্রভৃতি ভাষায় মোট ২৭টি কাহিনিচিত্রের পাশাপাশি ৫টি তথ্যচিত্র সহ দুরদর্শন চিত্র এবং ধারাবাহিক নির্মাণ করেছেন। হিন্দী ভাষায় নির্মিত কাহিনিচিত্র ভুবন সোম (১৯৬৯) জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মানের পাশাপাশি নতুন ধারার ভারতীয় ছবির পথিকৃৎ হিসাবে তাঁকে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়।

মৃণাল সেন পরিচালিত ছবিগুলি ৩২টি জাতীয় পুরস্কারের পাশাপাশি ৩৭টি আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। চলচ্চিত্রের জন্য পুরস্কারের পাশাপাশি ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ল্যান্ড পুরস্কার এবং ১৯৮১ সালে পদ্মভূষণ লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট চলচ্চিত্রের শতবর্ষে সারা পৃথিবীর দশ জন নির্বাচিত পরিচালককে তথ্যচিত্র নির্মাণের দায়িত্ব দেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন মৃণাল সেন।

 

মৃণাল সেন । বাংলা চলচ্চিত্রের অভিধান

 

২০০৩ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার দিয়ে তাঁকে সম্মান জানানো হয়। চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নিয়ে বিভিন্ন সময়ে লেখালেখিও করেছেন।

চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রথম গ্রন্থ ‘চার্লি চ্যাপলিন’ ১৯৫৭ সালে শতাব্দী (গ্রন্থজগৎ) থেকে প্রকাশিত হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই বইটির প্রচ্ছদ অঙ্কন করেন সত্যজিৎ রায়। ১৯৭২ সালে বেঙ্গল পাবলিশার্স তাঁর লেখা ‘আমি এবং চলচ্চিত্র’ প্রকাশ করে। ‘চলচ্চিত্র ভূত বর্তমান ভবিষ্যৎ’ গ্রন্থটি গ্রন্থপ্রকাশ থেকে ও ‘ভিউজ অন সিনেমা’ গ্রন্থটি ঈশান থেকে ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হয়।

 

মৃণাল সেন । বাংলা চলচ্চিত্রের অভিধান

 

বাংলা ভাষায় তাঁর লেখা অন্যান্য গ্রন্থ সিনেমা, আধুনিকতা ১৯৯২ সালে, তৃতীয় ভুবন ২০১১ সালে এবং বাণীশিল্প থেকে আমি ও আমার সিনেমা ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও তাঁর কয়েকটি সাক্ষাৎকার নিয়ে সংকলিত ইংরাজি গ্রন্থ মন্তাজ লাইফ, পলিটিক্স, সিনেমা ২০০২ সালে, অলওয়েজ বিয়িং বর্ন ২০১১ সালে এবং চ্যাপলিন ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর কয়েকটি ছবির চিত্রনাট্যও গ্রন্থাকারে এবং পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

১৯৮৪ সালে রাইনার্ড হাউফ তাঁর উপর তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। ছবিটির নাম টেন ভেজ ইন ক্যালকাটা এ পোর্ট্রেট অফ মৃণাল সেন। পরবর্তী কালে বিভিন্ন তথ্যচিত্র পরিচালক তাঁর উপর অন্তত পাঁচটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন।

তাঁর উপর প্রথম গ্রন্থ প্রলয় শুর সম্পাদিত ‘মৃণাল সেন’ ১৯৮৭ সালে বাণীশিল্প থেকে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী কালে তার উপর বেশ কয়েকটি বাংলা এবং ইংরাজি গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন পত্রিকা তাঁর উপর বিশেষ সংখ্যাও প্রকাশ করেছে।

 

চলচ্চিত্রপঞ্জি—
  • ১৯৫৫ রাতভোর;
  • ১৯৫৮ রাজধানী থেকে
  • ১৯৫৯ নীল আকাশের নীচে,
  • ১৯৬০ বাইশে শ্রাবণ
  • ১৯৬১ পুনশ্চ
  • ১৯৬৩ অবশেষে,
  • ১৯৬৪ – প্রতিনিধি
  • ১৯৬৫ আকাশকুসুম;
  • ১৯৬৬ জোড়দীঘির চৌধুরী পরিবার : মাটির মনিষ (ওড়িয়া)।
  • ১৯৬৭ মুভিং পারসপেকটিভ (তথ্যচিত্র)
  • ১৯৬৯ ভুবন সোম (হিন্দী)
  • ১৯৭০ ইচ্ছাপূরণ, ইন্টারভিউ:
  • ১৯৭১ এক আধুরী কাহানী (হিন্দী)
  • ১৯৭২ কলকাতা ৭১
  • ১৯৭৩ পদাতিক:
  • ১৯৭৪ কোরাস,
  • ১৯৭৬ মৃগয়া (হিন্দী):
  • ১৯৭৭ ওকা উড়ি কথা (তেলুগু),
  • ১৯৭৮ পরশুরাম,
  • ১৯৭৯ একদিন প্রতিদিন।
  • ১৯৮০ আকালের সন্ধানে;
  • ১৯৮১ চালচিত্র,
  • ১৯৮২ খারিজ,
  • ১৯৮৩ খন্দহর (হিন্দী)
  • ১৯৮৫ কভি দূর কভি পাস (হিন্দী),
  • ১৩ পর্বের টেলিফিল্ম):
  • ১৯৮৬ জেনেসিস (হিন্দী)
  • ১৯৮৯ ক্যালকাটা মাই এলডোরাডো (তথ্যচিত্র), একদিন অচানক (হিন্দী):
  • ১৯৯১ মহাপৃথিবী:
  • ১৯৯৩ অন্তরীণ
  • ১৯৯৫ শো গোজ অন্য
  • ২০০২ আমার ভুবন।

Leave a Comment