বংশী চন্দ্রগুপ্তর জন্ম অবিভক্ত পাঞ্জাবের শিয়ালকোটে। ছোটবেলায় পালিত পিতার সাথে জম্মুতে চলে যান। স্কুল শিক্ষা জম্মুতেই। ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সমর্থনে কলেজের পড়া অসমাপ্ত রেখেই আন্দোলনে যুক্ত হন।

বংশী চন্দ্রগুপ্ত । বাঙালি চলচ্চিত্র অভিনেতা
১৯৪৪ সালে সুভো ঠাকুরের সাথে পরিচয়, অঙ্কন শিক্ষার হাতেখড়ি তাঁর কাছেই। সুভো ঠাকুরের সাথে কলকাতায় আসেন অঙ্কনে উচ্চশিক্ষা লাভের আশায়। ক্যালকাটা গ্রুপের সাথে যুক্ত হন, সেখানে পরিচয় হয় নীরদ মজুমদার, রথীন মৈত্র, গোপাল ঘোষ, প্রদেহ দাশগুপ্ত, পরিতোষ সেন প্রভৃতির সাথে। বইয়ের মলাট এঁকে, গল্প-উপন্যাস ইত্যাদির অলংকরণের কাজ করে নিজের খরচ চালাতেন।
চলচ্চিত্রে প্রথম কাজ হেমেন গুপ্ত পরিচালিত অভিযাত্রী (১৯৪৭)। বটু সেনের অধীনে কাজ শুরু করেন। এই ছবিতে একটি শ্রমিক নেতার ভূমিকায় তিনি অভিনয়ও করেছিলেন। এস নাবাং-এর অর্থানুকূল্যে তৈরি বেঙ্গল ন্যাশনাল স্টুডিওতে কিছুদিন শিল্প নির্দেশক হিসাবে কাজ করেছেন, সাথে সাথে অভিনেতা অভিনেত্রীদের হিন্দী সংলাপ শেখানোর কাজও করতেন।

১৯৪৭ সালে সত্যজিৎ রায়ের সাথে যোগাযোগের সূত্রে হরিসাধন দাশগুপ্ত, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, রাধাপ্রসাদ গুপ্ত, অজয় করের সাথে পরিচয় এবং কলকাতা ফিল্ম সোসাইটির পতন। সহকারী শিল্প নির্দেশক হিসাবে রেনোয়া পরিচালিত ‘দি রিভার’ ছবির সাথে যুক্ত হন। সত্যেন বসু পরিচালিত ভোর হয়ে এলো (১৯৫৩) ছবিতে শিল্প নির্দেশক হিসাবে দেখা দেন। বাংলা ছবিতে এই প্রথম বাস্তবধর্মী সেট তৈরি করা হয়।
১৯৫২ সালে প্রণব রায়ের দেওয়া নাট্যরূপ অবলম্বনে ওমর খৈয়াম নৃত্যনাট্যের শিল্প নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী (১৯৫৫) থেকে শুরু করে প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০) পর্যন্ত সব কটি ছবির শিল্প নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে সত্যজিতের হিন্দী ছবি শতরঞ্জ কে খিলাড়ী-র শিল্প নির্দেশনাও তাঁর। এই ছবিতে ওয়াজীন আলীর রাজ দরবার, সিংহাসন, মাথার মুকুট এবং জেনারেল আউটরামের ঘরের সেট তৈরির কাজে তাঁর অসামান্য দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়।
অপরাজিত ছবিতে অপুদের বেনারসের বাড়ি, জলসাঘর। ছবির ঘরের ভিতরের দৃশ্য স্টুডিওতে তোলা হয়েছে, শিল্প নির্দেশনার কাজ এতই নিখুঁত যে আসল নকল বোঝা প্রায় অসম্ভব। পিরিয়ড ছবিগুলিতে যেমন জলসাঘর, দেবী, চারুলতা, শতরঞ্জ কে. খিলাড়ী ইত্যাদি ছবিগুলিতে তাঁর কাজের অসামান্য দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। নায়ক ছবির অনেকটাই স্টুডিওতে তোলা হয়েছে কৃত্রিম ট্রেনের কামরা তৈরি করে। ট্রেনের ডাইনিং কার, করিডোর, টয়লেট ইত্যাদি আলাদা ভাবে স্টুডিওতে তৈরি করা হয়েছিল যদিও ছবি দেখে সেটা বোঝা যায় না।

পথের পাঁচালীর কাজ চলাকালীন তিনি ভগবান শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ছবির শিল্প নির্দেশনার কাজও করেন, এই ছবির কাজ করতে গিয়ে তিনি স্টুডিওর মধ্যে দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের সেট বানিয়েছিলেন। সত্যজিৎ ছাড়াও মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার সহ বহু পরিচালকের সাথে কাজ করেছেন।
মৃণাল সেনের বাইশে শ্রাবণ (১৯৬০), পুনশ্চ (১৯৬১), অবশেষে (১৯৬৩), প্রতিনিধি (১৯৬৪), আকাশকুসুম (১৯৬৫) এবং কলকাতা ৭১ (১৯৭২), তরুণ মজুমদারের পলাতক (১৯৬৩), আলোর পিপাসা (১৯৬৫), একটুকু বাসা (১৯৬৫), বালিকা বধু (১৯৬৭) ইত্যাদি ছবির শিল্প নির্দেশনা দিয়েছেন।
তিনি সবসময় পরিচালকের মর্জি অনুযায়ী সেট তৈরি করেন নি, প্রয়োজনে পরিচালককে পরামর্শ দিয়েছেন, ডিটেল-এর কাজ নিখুঁত করার জন্য বারবার পরীক্ষা নিরীক্ষার এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিষয়টির গভীরে ঢোকার চেষ্টা করেছেন। তিনি কখনও আপোশ করতে চান নি, perfection’ শব্দটি ছিল তাঁর মন্ত্র।
শিল্প নির্দেশনার মধ্য দিয়ে তিনি কিছু সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। এই সৃষ্টি করার কাজে তিনি কখনও ডিজাইনার, কখনও আর্টিস্ট, আবার কখনও কারিগর হিসেবে হাতে কলমে কাজ করে অধস্তনদের কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন।
১৯৭২ সালে বোম্বে চলে যান। রাজেন্দ্র ভাটিয়া, বাসু চ্যাটার্জী, বি আর চোপড়া, শ্যাম বেনেগাল, কুমার সাহানী, অবতার কাউল ইত্যাদি পরিচালকের সাথে কাজ করেছেন। এছাড়াও দুটি তথ্যচিত্রের শিল্প নির্দেশনার সাথে নিজে তিনটি তথ্যচিত্র পরিচালনা করেছেন। তার পরিচালনায় তৈরি মিমসেস অফ ওয়েস্টবেঙ্গল (১৯৬৭) তথ্যচিত্রটি রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক লাভ করে।
প্রকাশনা –
চিত্রভাষ পত্রিকা ১৯৮১ সালে তাঁর উপর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। এছাড়াও অরুণকুমার রায়ের লেখা শিল্পনির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্ত’ গ্রন্থটি ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয়।
চলচ্চিত্রপঞ্জি —
- ১৯৫৩ ভোর হয়ে এলো
- ১৯৫৫ পথের পাঁচালী, ভগবান শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
- ১৯৫৬ অপরাজিত:
- ১৯৫৭ অন্তরীক্ষ:
- ১৯৫৮ পরশপাথর, জলসাঘর
- ১৯৫৯ অপুর সংসার, খেলাঘর
- ১৯৬০ দেবী, বাইশে শ্রাবণ
- ১৯৬৩ অবশেষে, পলাতক, শেষ প্রহর, মহানগর
- ১৯৬৪ প্রতিনিধি, চারুলতা
- ১৯৬৫ আলোর পিপাসা, বাক্সবদল, একটুকু বাসা, কাপুরুষ ও মহাপুরুষ, আকাশকুসুম:
- ১৯৬৬ নায়ক
- ১৯৬৭ হঠাৎ দেখা, বালিকা বধু, চিড়িয়াখানা:
- ১৯৬৮ পঞ্চশর
- ১৯৬৯ গুপী গাইন ও বাঘা বাইন
- ১৯৭০ অরণ্যের দিনরাত্রি, প্রতিদ্বন্দ্বী,
- ১৯৭২ কলকাতা ৭১।
