পঙ্কজকুমার মল্লিকের জন্ম কলকাতার মানিকতলা অঞ্চলে। প্রথমে সিটি ইনস্টিটিউশন মাইনর স্কুলে পরে বউবাজার হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি হন। সংগীতশিক্ষা দুর্গাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পরে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে রবীন্দ্রসংগীতের শিক্ষা নেন। কিছুদিন একটি বেসরকারি অফিসে চাকরিও করেছেন।

পঙ্কজকুমার মল্লিক
প্রথম বেতার অনুষ্ঠান করেন ১৯২৭ সালে। ১৯২৬ সালে ভাইলোফোন/বিয়েলোফোন রেকর্ড কোম্পানি থেকে বাণীকুমারের কথায় তার প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি রঙ্গমঞ্চেও তিনি সংগীত পরিচালনা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল স্বয়ম্বরা এবং সন্তান।
চলচ্চিত্রে প্রথম কাজ ১৯৩১ সালে নির্বাক ছবি চোরকাঁটা ও চাষার মেয়ে। এই ছবি দুটির জন্য দ্বৈত ভাবে রাইচাঁদ বড়ালের সাথে সংগীত সৃষ্টি করেন পর্দার তলায় বসে বাজানোর জন্য। নিউ থিয়েটার্স তৈরির সময় থেকেই সংগীত বিভাগে যুক্ত হন।

দেবদাস (১৯৩৫), গৃহদাহ (১৯৩৬), মায়া (১৯৩৬) এবং দিদি (১৯৩৭) ছবিতে যুগ্ম ভাবে রাইচাঁদ বড়ালের সাথে সংগীত পরিচালনা করেছেন। স্বাধীন সংগীত পরিচালক হিসাবে প্রথম কাজ প্রমথেশ বড়ুয়া পরিচালিত মুক্তি (১৯৩৭) ছবিতে। এই ছবিতে সংগীত পরিচালনার পাশাপাশি তিনি ‘পাহাড়ী’ নামে এক হোটেল মালিকের চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন।
এই ছবির সংগীত অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। চারটি রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি এই ছবিতে অজনা ভট্টাচার্য এবং সজনীকান্ত দাসের লেখা গান ব্যবহার করেন, রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে! গানটির সুরও দিয়েছিলেন পঙ্কজকুমার এবং ছবিতে তাঁর কণ্ঠেই এই গানটি শোনা গিয়েছিল।
পরে দেশের মাটি (১৯৩৮), বড়দিদি (১৯৩৯), জীবনমরণ (১৯৩৯), ডাক্তার (১৯৪০), নার্স সিসি (১৯৪২), প্রতিবাদ (১৯৪৮), রূপকথা (১৯৫০), মহাপ্রস্থানের পথে (১৯৫২) বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনা (১৯৭২) ইত্যাদি ছবিতে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছিলেন।
চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসংগীতের যথাযথ ব্যবহার প্রথম তিনিই করেছিলেন। অনেক ক্ষেত্রেই গান গাওয়ার জন্যই অভিনয়েও অংশ নিয়েছেন, মুক্তিতে ‘পাহাড়ী’ চরিত্রের পাশাপাশি ডাক্তার ছবিতে নামভূমিকায় অভিনয় করেন। দেশের মাটি (১৯৩৮) ছবিতেও গানের প্রয়োজনে এক উকিলের চরিত্রে অভিনয় করেন।

অধিকার (১৯৩৯) ছবিতেও একটি পার্শ্বচরিত্রে তাঁর গান ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া তাদের আবার দুঃখ কিসের’ গানটি জনপ্রিয় হয়েছিল।
অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশন প্রযোজিত রাইকমল (১৯৫৫) ছবির সংগীত পরিচালনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য অন্যান্য কাজগুলির মধ্যে আছে বেতারে ‘সংগীত শিক্ষার আসর” এবং মহিষাসুর মর্দিনী। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লোকরঞ্জন শাখার জন্ম থেকেই এই শাখার উপদেষ্টা ছিলেন। বারো বছর এই কাজ তিনি নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন।
বিভিন্ন বেসরকারি পুরস্কারের পাশাপাশি ১৯৭০ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত করেন এবং সারা জীবন চলচ্চিত্রে উল্লেখযোগ্য কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭২ সালে তাঁকে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার প্রদান করা হয়। ১৯৭৮ সালে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
সমগ্র চলচ্চিত্র জীবনে ২৬টি বাংলা ছবিতে সংগীত পরিচালনার পাশাপাশি ৯টি ছবিতে নেপথ্য গায়ক বা গায়ক/অভিনেতা হিসাবে কাজ করেছেন। প্রমথেশ বড়ুয়া, নীতিন বসু, অমর মল্লিক, ফণী মজুমদার, দেবকী বসু, মধু বসু, প্রেমায়ুর আতর্থী, সুবোধ মিত্র, হেমচন্দ্র চন্দ্র, কার্তিক চট্টোপাধ্যায়, সৌরেন সেন, তপন সিংহ, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, হীরেন নাগ প্রভৃতি চলচ্চিত্র পরিচালকের সাথে কাজ করেছেন।
চলচ্চিত্রপঞ্জি —
- ১৯৩৫ দেবদাস, ভাগ্যচক্র
- ১৯৩৬ মায়া
- ১৯৩৭ দিদি, মুক্তি,
- ১৯৩৮ * দেশের মাটি,
- ১৯৩৯ বড়দিদি, জীবনমরণ
- ১৯৪০ *ডাক্তার,
- ১৯৪১ নর্তকী,
- ১৯৪২ মীনাক্ষী,
- ১৯৪৩ কাশীনাথ, দিকশূল
- ১৯৪৫ দুই পুরুষ,
- ১৯৪৭ নার্স সিসি, রামের সুমতি:
- ১৯৪৮ প্রতিবাদ,
- ১৯৫০ রূপকথা,
- ১৯৫২ মহাপ্রস্থানের পথে
- ১৯৫৩ বনহংসী, নধীনযাত্রা,
- ১৯৫৫ রাইকমল, চিত্রাঙ্গদা
- ১৯৫৮ লৌহকপাট,
- ১৯৬১ আহ্বান:
- ১৯৭২ বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনা।
অভিনেতা হিসেবে
- ১৯৩৮ অভিজ্ঞান,
- ১৯৩৯ অধিকার
- ১৯৪০ “আলোছায়া।
নেপথ্য গায়ক হিসেবে
- ১৯৬০ নদের নিমাই,
- ১৯৬৬ মণিহার।
* চিহ্নিত ছবিগুলিতে সংগীত পরিচালনার পাশাপাশি নেপথ্য গায়ক হিসেবেও কাজ করেছেন।
