আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ ইউরোপের চলচ্চিত্র ভেরাড্রেক ।
ইউরোপের চলচ্চিত্র ভেরাড্রেক
ভেরাড্রেক
চলচ্চিত্রের কাহিনী সংক্ষেপ : অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ফলে বিপর্যয় নেমে আসা নারীদের জীবন বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়া এক নারী ভেরাড্রেকের বিপদসংকুল পথপরিক্রমা।
দেশ : ব্রিটেন
পরিচালক : মাইক লিগ
লেখক :মাইক লিগ
রিলিজ ডেট : ২২ অক্টোবর ২০০৪
মুখ্য চরিত্র : ইমেলদা স্টাউনটন
পিল ডেভিস
ড্যানিয়েল ময়েস
অ্যালেক্স কেলি
ভেরাড্রেক
মানুষ প্রতিনিয়ত সুখ বা দুঃখ অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত। এই সুখ-দুঃখ অনুভূতির বাইরেও মানুষের জীবনে কিছু মিশ্র অনুভূতি আছে। যেমন দুঃখকর সুখ অনুভূতি। তেমনি একটা অনুভূতি মাতৃত্ব। প্রসববেদনায় গলাকাটা মুরগির মতো কাতরাচ্ছে, এটা বেদনার কিন্তু নবশিশুর মুখ দেখে মাতৃত্বের জয়গাথা স্বীকৃত হচ্ছে, এটা আনন্দের।
তবে গর্ভজাত সন্তানটি যদি আসে কুমারী মায়ের গর্ভে তখন কি আর তা আনন্দের থাকে? সমাজ-সংসার আত্মীয়স্বজন কি বাবার অস্তিত্ব বিনা সন্তানকে গ্রহণ করতে রাজি। রাজি না। শুধু যে কুমারী মা সে প্রশ্ন নয়। যুদ্ধ মানুষের সব কেড়ে নেয়।
মেয়ের সম্ভ্রম পর্যন্ত। সম্ভ্রম হারানোর মধ্য দিয়ে যদি সন্তান আসে তবে সেক্ষেত্রে মায়ের কি করণীয়। এরকম হাজার প্রশ্নের বিপরীতে গর্ভপাত করাটা ঠিক না বেঠিক? এটা এখন তামাম বিশ্বের মানুষের প্রশ্ন। চলচ্চিত্রকাররাও এ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে চুপ করে বসে থাকতে পারেন না।
ইংল্যান্ডের কালজয়ী পরিচালক মাইক লিগ নিজের লেখা কাহিনীর ভিত্তিতে নির্মাণ করলেন মুভি ‘ভেরাট্রেক’ যেখানে এরকম কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা। ২০০৪ সালের অস্কার পুরস্কারের জন্য তিনটি ক্যাটেগরিতে এই মুভি নমিনেশন পায়— সেরা পরিচালক, সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য এবং সেরা অভিনেত্রী।
সংসারে এমন কিছু মানুষ থাকেন যারা কখনোই কাউকে না বলতে পারেন না। হাজার ঝড় বইলেও তারা টলেন না। আন্তরিক চেষ্টা, স্নেহপ্ৰৰণ ভালোবাসা নিয়ে সংসারের সবাইকে আগলে রাখেন। এমনই একজন ষাটোর্ধ্ব মহিলা ভেরাট্রেক।
তিনি একজন ভালো মা, ভালো স্ত্রী এবং ভালো প্রতিবেশী। তার এক পুত্র সিড এবং এক কন্যা ইথেল। সিড একজন দর্জি, কাস্টমারের মাপ-জোক নেয় আর স্যুট-প্যান্ট বানায়। কন্যা ইথেল একটি ফ্যাক্টরিতে পার্টটাইম চাকরি করে।
স্বামী স্টানের একটা গ্যারেজ। ঘরে বৃদ্ধ মা। সবার প্রতিই তারা সমান দায়িত্ব কর্তব্য। এই জল ফুটিয়ে দিচ্ছে তো আবার ঘর পরিষ্কার করছে। স্বামীকে চা বানিয়ে দিচ্ছে তো দুপুরের খাবার রাঁধছে। ঘর সাজাচ্ছে তো আবার প্রতিবেশী প্যারালাইজড রোগীর সেবা
করছে। পুত্র-কন্যার সব আবদার শেষ করে মাঝ রাতে স্বামীকে কাছে টেনে নিচ্ছে পরম মমতায়।ভেরাড্রেকের সব কাজ সবাই জানলেও একটা কথা সংসারের সবার অজানা। সেটা হলো ভেরাড্রেকের ধাত্রীজীবন। সবাই জানে ভেরাট্রেক সংসারে দুটি বাড়তি পাউন্ডের জন্য বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করে।
যেটা জানে না সেটা হলো কাজের ফাঁকে ফাঁকে যেসব অল্প বয়সের মেয়েরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ করেছে সেই অভিশপ্ত গর্ভধারণের হাত থেকে গর্ভপাত করানোর কথা। খুব সামান্য উপকরণ ব্যবহার করে ভেরাডেক আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আনে মেয়েটিকে।
স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারায় সবাই ভেরাট্রেকের প্রতি কৃতজ্ঞ। ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন কারণে ভুক্তভোগী। কেউ হয়তো ডিস্কোতে নেচে মাতাল হয়ে মাতাল বন্ধুর আক্রমণের শিকার। কারো হয়তো স্বামী কর্মসূত্রে বিদেশে।
স্বাভাবিক একটু কথাবার্তা মেলামেশা নিঃসঙ্গতা দূর করতে গিয়ে সামান্য সময়ে হিংস্র বন্য আক্রমণের শিকার। বিদেশে থাকা স্বামীই তার ভালোবাসা, ফলে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পশুর বীজ সে রাখবে না কিছুতেই। আবার কেউ পাঁচটি সন্তানকে খেতে দিতে পারে না ঠিকমতো সেখানে জোর করে দেহের তৃপ্তি পেতে গিয়ে পুনরায় ঝামেলার শিকার। ফলে সবারই দরকার ভেরাড্রেককে।
আবার কিছু উগ্র মেয়ে আছে যে পছন্দের ভালোবাসাকে আদায় করতে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে কনসিভ করে মাসখানেক ছেলেটাকে নাকে দড়ি পরিয়ে নাকানি-চুবানি খাইয়ে নিজের ইচ্ছাতেই অ্যাবরশন করাচ্ছে কারণ পাত্র হাসিল, সস্তান নেয়া যাবে না বছর পাঁচেক। কারণ যেভাবেই আসুক না কেন ভেরাট্রেক সবার প্রতি মমতা নিয়েই কাজটি করেন। এরকম ক্ষেত্রে মানুষটির সাহায্য দরকার, ভেরাদ্রেক না করতে পারেন না।
চলচ্চিত্রে পরিচালক মাইক লিগ ভেরাট্রেকের পাশাপাশি একটি চরিত্র এনেছে সুসান। সে তার ভালো লাগার, পছন্দের ছেলেটির কাছ থেকে হঠাৎ করে অনভিপ্রেত আক্রমণের শিকার হয়েছে। সুসানের বাবা ইংল্যান্ডের মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্সের বড় কর্তা।
কি করবে সুসান? মেয়েকে মেয়ে না বাঁচালে বাঁচাবে কে? এক টিচার ম্যাডাম সাহায্যের হাত বাড়ায়। ডাক্তার, সাইক্রিস্ট পরীক্ষায় নিশ্চিত সন্তান আগত। ১৯৫০-এর প্রেক্ষাপটে ইংল্যান্ডের আইনে গর্ভপাত নিষিদ্ধ। একমাত্র পথ অন্যভাবে কিন্তু সেখানে খরচা ১৫০ পাউন্ড। আজ থেকে ৫০ বছর আগে ১৫০ পাউন্ড মানে সেটা কল্পনাতীত।
পরিচালক মাইক লিগ বোঝাতে চেয়েছেন যদিওবা মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্সের এক বড়কর্তার মেয়ে সুসানের পক্ষে এই অবৈধ গর্ভপাত ঘটানোর খরচটা জোগাড় করা সম্ভব হয় তবুও ইংল্যান্ডের মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত মানুষের পক্ষে সেটা অসম্ভব। ফলে ভেরাত্রে সেটা বিনা পয়সার করে থাকেন যেটা তার মহত্ত্বেরই পরিচয়।

ভেরাট্রেক কাজটি করেন শুধু সাহায্যের জন্য, কোনো পাউন্ড নেন না। ভেরা ড্রেকের বান্ধবী লিলি ভেরাট্রেকের সরলসিধে মানসিকতার সুযোগ নেয়। বড় বড় পার্টির কাছ থেকে বড় অংকের পাউন্ড নিয়ে, ভেরাড্রেককে সাহায্য করার নাম করে ভেরাড্রেককে নিয়ে কাজটি করিয়ে নেয়।
লিলির অনুরোধে পামেলা মেরি বার্নস নামের এক কুমারীর উপকার করতে গিয়ে ফেঁসে যায় ভেরাট্রেক। পামেলা মেরি বার্নস ইনফেকশনে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুপথযাত্রী হওয়ায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। প্রয়োজন পড়ে দ্রুত অপারেশনের। অপারেশনে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকায় ডাক্তার পুলিশকে ইনফর্ম না করে কিছু করবে না নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
ডেরাড্রেকের মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে যখন ঘরভর্তি লোক সে সময় অনুহতের মতো এসে উপস্থিত পুলিশ। পুলিশকে দেখে ভেরাড্রেকের যে চাহনি তা দেখার মতো একটা ক্লোজ শট। স্বামী-পুত্র-কন্যা পড়শি জানলে যে সব শেষ হয়ে যাবে । কিন্তু ব্রিটিশ পুলিশ স্বভাবতই ভদ্র। পাশের ঘরে অনুরোধ করে এককভাবে ভেরাড্রেকের সঙ্গে কথা বলতে।
সাধারণ সাবান, ওষুধ কৌটা আর একটা সামান্য প্রেসারযন্ত্রে এতো দীর্ঘদিন সফল চিকিৎসা করছে এটা পুলিশ অফিসারের কাছে বিস্ময়। সব কথার সঠিক উত্তর দেয়ার ব্যবহারে অফিসার তৃপ্ত। আইনি ফর্মুলায় ভেরাড্রেককে থানায় নেয় ঠিকই, তবে পরিবারের কারো কাছেই দোষটা বলে ভেরাড্রেকের যন্ত্রণা বাড়িয়ে তোলেন না। সঙ্গে শুধু স্বামী যান।
থানায় জেরা পর্বে অফিসার বিস্মিত, কারণ এই কাজ করে ভেরাট্রেক কখনোই একটা পয়সা নেননি। এটা তার কাছে উপকার করা এবং সেবা করা। অফিসার নিশ্চিত হন বিশ বছরের মতো দীর্ঘ সময় তিনি এই কাজ করলেও দুর্ঘটনা এবারই প্রথম এবং কারণ পাইপের ইনফেকশন।
অফিসারের একটা প্রশ্ন সবাইকে থামিয়ে দেয়, আপনার জীবনে কখনো কি এরকম দুর্ঘটনা এসেছিল? চলচ্চিত্রের শুরুটা ১৯৫০ সালে। গত বিশ বছর ধরে ভেরাডেক কাজটি করছেন। এই বিশ বছরের মধ্যেই তো দু দুটি বিশ্বযুদ্ধ।
ঘরে আগুন লাগলে কে না পোড়ে? ব্যথা না পেলে ব্যথিতের যন্ত্রণা বোঝে কিভাবে? ভেরাট্রেক মুখে কিছু বলে না। সাইলেন্স অ্যাকটিং কত তীব্র হতে পারে, সব বোঝাতে পারে, ভেরাড্রেক চলচ্চিত্র না দেখলে বোঝা যায় না।

চলচ্চিত্রের শেষে ভেরাট্রেকের দুই বছর জেল হয়। ছেলে সিড মায়ের কাজটাকে ক্রিমিন্যাল অ্যাকটিভ হিসেবে দেখে। মেয়ে ইথেল মনে করে তার মা পৃথিবীর সেরা মা, কারণ অনেক মেয়ে মৃত্যুর পথ বেছে নিতে পারতো, তার মায়ের কারণেই তারা বেঁচে রইলো।
আর স্বামী স্টান! তার একটাই বিশ্বাস, আইনের চোখে তার স্ত্রী ভেরাড্রেক দোষী কিন্তু স্রষ্টা বলে কেউ যদি থাকেন তবে তিনি নিশ্চিত ভেরাড্রেককে ভালোবাসেন এবং তাকে অন্তিমে পুরস্কৃত করতে ভুলেও ভুল করবেন না।
