আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ ইউরোপের চলচ্চিত্র ফ্রস্ট/নিক্সন।
ইউরোপের চলচ্চিত্র ফ্রস্ট/নিক্সন

ফ্রস্ট/ নিক্সন
কাহিনী সংক্ষেপ :
ওয়াটার গেট কেলেংকারিতে জড়িয়ে যাওয়া আমেরিকার সাঁইত্রিশতম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের একান্ত সাক্ষাৎকার গ্রহণ করলেন কিভাবে ব্রিটিশ টেলিভিশন সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট সেই প্রেক্ষাপটের চলচ্চিত্র।
দেশ : আমেরিকা, ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের যৌথ নির্মাণ
পরিচালক : রন হাওয়ার্ড
লেখক : পিটার মর্গান (নাটক)
পিটার মর্গান (চিত্রনাট্য)
রিলিজ ডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০০৯
মুখ্য চরিত্র : ফ্রাঙ্ক ল্যাংগেলা
মাইকেল শেন
কেভিন বেকন
ফ্রস্ট/ নিক্সন
রিপাবলিকান। রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। তার দলের লোকজন। গোপনে ডেমোক্রেট সদর দপ্তরে আড়ি পাতার যন্ত্র বসায়। একদিকে যেমন তথ্য জানতে পারে তেমনি অন্যদিকে তাদের গোপন নথিপত্র সরিয়ে ফেলে।
এ সবকিছুর মূলে ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন। সে যাত্রায় তিনি পুনরায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিতলেও কিছুদিনের মধ্যে আড়ি পাতার ঘটনা ফাঁস হয় এবং পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাবের চাপ আসন্ন জেনে নিজ অপরাধ স্বীকার করে পদত্যাগ করে স্বেচ্ছা নির্বাসনে ক্যালিফোর্ণিয়া চলে যান।
এই চলে যাওয়া দিয়েই চলচ্চিত্র শুরু । অসংখ্য ভ্রাম্পকাটের মধ্য দিয়ে দর্শকদের কাছে যেটি পরিষ্কার হয় সেটি হলো প্রিন্ট, বেতার ও টিভি মাধ্যমের উপস্থিতিতে তিনি তার পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেন এবং একটি হেলিক টারে চড়ে প্রেসিডেন্টের বাসভবন হোয়াইট হাউজ ছেড়ে চলে যান।
টিভি মনিটরে চোখ রেখে দর্শকদের মুখে তিরস্কার-পুরস্কার যাই থাকুক না কেন ডেভিড ফ্রস্টের মননে অন্য চিন্তা। এই বিদায় মুহূর্ত পৃথিবীর কত কোটি দর্শক দেখছে? ফ্রস্ট ওভার অস্ট্রেলিয়া প্রোগ্রাম চলাকালেই তার প্রযোজক, বন্ধু এবং শুভনুধ্যায়ী লন্ডন উইকেন্ড টেলিভিশনের প্রযোজক জন বিরথের কাছে প্রশ্ন, সাক্ষাৎকারের বিষয় হিসেবে রিচার্ড নিক্সন কেমন হয়? চারশো কোটি মানুষ যার বিদায়ক্ষণ দেখে বিষয় হিসেবে তার থেকে ভালো কি হতে পারে।
ভালো সম্পর্ক যে কোনটি হলে ভালো হয় প্রযোজক এবং উপস্থাপকের মধ্যে সেটা বলা একটু কঠিন। তবে সফল উপস্থাপক মাত্রই মনে করে যদি সম্পর্কটা হয় স্বামী-স্ত্রীর মতো অর্থাৎ কেউ কাউকে না ছাড়িয়ে আজীবন একই ছাদের তলে বসবাস তবে সেটাই ভালো।
ডেভিড ফ্রস্ট এবং জন বিরথের সম্পর্কটাও সেরকম। সাত পাঁচ না ভেবেই সোজা চড়ে বসলেন ক্যালিফোর্নিয়ার বিমান সিটে। সাথে সঙ্গী করে নিলেন বিমানযাত্রী ললনা রূপসী ক্যারোলিনকে। ডেভিড ফ্রস্ট ভালোভাবেই জানেন পরিবেশকে রঙিন রাখতে রঙের, সুন্দর মুখের উপস্থিতি খুব জরুরি ।।
উপস্থিতির ক্ষেত্রে যেটি সব থেকে বেশি জরুরি সেটি হলো অর্থ। চলচ্চিত্রে যেমন সেন্সর বোর্ড, ব্রান্ড পণ্যের ক্ষেত্রে যেমন এক্সপেয়ারের তারিখ, সেলিব্রেটিকে পেতে যেমন অ্যাপয়নমেন্ট একেকটা বড় দেওয়াল তেমনি রিচার্ড নিক্সনকে পেতে বড় দেয়াল প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ জ্যাক বিমান।
জ্যাক বিমান চরিত্রে কেভিন বেকনের অভিনয় দেখার মতো নিঃশব্দ অভিনয়ে কত হাজার পাতার সংলাপ বলা যায়, মনিবকে রক্ষা করতে কত বিশ্বস্ত হতে হয়, দূরভিসন্ধি লোককে চোখের পলকে চিনে নিতে হয়, সুসময় এবং বিপর্যয় যাই আসুক উভয় সময় কিভাবে নিজের মানুষকে আগলে রাখতে হয় সেটা কেভিন বেকনের অভিনয় না দেখলে বোঝা অসম্ভব।
জ্যাক ব্রিনান ডেভিড ফ্রস্টের সব কথা শুনে রাজি হয় এই সাক্ষাৎকারের কিন্তু শর্ত দুই লক্ষ ডলার। এত ডলার যোগাড় ডেভিড ফ্রস্টের প্রযোজকের পক্ষে অসম্ভব জেনেও পিছপা হয় না ডেভিড ফ্রস্ট (লন্ডন উইকেন্ড টেলিভিশনের শেয়ার বিক্রি করে। এবং চলার পথের সহযোগী বিত্তবান বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে চুক্তি পত্রে সই করে ডেভিড ফ্রস্ট। ডেভিড ফ্রস্টের বিশ্বাস মূল্যবান জিনিস মূল্য দিয়েই গ্রহণ করা উচিত।
গ্রহণ-বর্জনের প্রশ্নে হোক সেটা বেতার, টিভি, নাটক কিংবা চলচ্চিত্র মূল কথা স্ক্রিপ্ট। যা খুশি একটা প্রশ্ন করা কিংবা প্রশ্ন না শুনে উত্তর দেয়ার মতো ব্যক্তিত্ব না ডেভিড ফ্রস্ট না রিচার্ড নিক্সন। তাই ডেভিড ফ্রস্ট দুজন সরাসরি ওয়াটার গেট কেলেংকারির উপর রিপোর্ট করা গবেষকদের গবেষণায় যুক্ত করে।
বব ভেলনিককে যুক্ত করে এক্সিকিউটিভ রিসার্সার হিসেবে এবং জেমস রেসটনকে গবেষক সহকারী হিসেবে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে কে সহযোগী হবে আর কে প্রতিদ্বন্দ্বী হবে সেটা একটু বলা কঠিন। জেমস রেসটন নিজেই রিচার্ড নিক্সনের উপর চারটি বই লিখেছে।
উপরন্তু সে আমেরিকান হয়ে এক ব্রিটিশ সেলিব্রেটির অধীনে কাজ করবে তাও আবার তাদের সাবেক বিতর্কিত প্রেসিডেন্টের ডার্ক সাইড নিয়ে ফলোআপ করতে। এক ক্ষমতাবান কি আরেক ক্ষমতাবানকে কোন কালে সহ্য করেছে?
অসহ্যকে ধৈর্য ধরে সহ্য করে চারজনের টিম টানা পঞ্চার দিনের গবেষণা শেষ করে। প্রযোজক বিরথ ভিয়েতনাম স্টাডি করে, বা জেলনিক স্টাডি করে পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা নীতি, রেসটন স্টাডি করে ওয়াটার গেট এবং ক্ষমতায়ন।
সবকিছুর সারাংশ নিয়ে নিজের মতো করে পেপার তৈরি করে প্রস্তুত ডেভিড ফ্রস্ট। কিন্তু অপ্রস্তুতভাবে কোন প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ জ্যাক বিনানের। তার একটাই জানতে চাওয়া, ওয়াটার গেট নিয়ে ডেভিড ফ্রস্টের অবস্থান কিন্তু সংবাদ পরিবেশনের আগে সাংবাদিককে জেরা করার নিয়ম আদৌ আছে কিনা জানা না থাকলেও হলভর্তি দর্শক উন্মুখ যে ডেভিড ফ্রস্ট প্রশ্নবাণে আমন্ত্রিত অতিথিকে এফোঁড় ওফোঁড় করে ফেলেন সেই ডেভিড ফ্রস্ট এবার নিজে কি করেন।
কিন্তু বুদ্ধিমান ব্যক্তিমাত্রই জানেন লক্ষ্যে পৌছানোর স্বার্থে মাথা ঠাণ্ডা রাখা কত জরুরি। মাথা গরম করার কোনো সুযোগ সেখানে নেই। পরম্পর কথোপকদনে সিদ্ধান্ত হয় মোট সাক্ষাৎকারের ত্রিশভাগ থাকবে ওয়াটার গেট প্রসঙ্গে।
ষাট ভাগ থাকবে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিজনের অর্জন সম্পর্কে। অবশিষ্ট দশ ভাগ একান্তই ডেভিড ফ্রস্টের। এই দশভাগের কথা বলার সময় ডেভিড ফ্রস্ট চরিত্রে মাইকেল শেনের যে অভিনয় এবং পরিচালক রন হাওয়ার্ডের যে কোজটি তাতে দর্শকমাত্রই বোঝো শেষ মার ওস্তাদের হাতে।
হাতাহাতি যুদ্ধ না মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। দুপাশে দুজন। ভয়ঙ্কর সব প্রশ্ন ছুঁড়ছে ডেভিড ফ্রস্ট। কেন আপনি টেপটি পোড়ালেন না। উত্তরে জল করে দিচ্ছেন রিচার্ড নিক্সন। গণতান্ত্রিক চর্চায় প্রমাণ বিলুপ্তিকে বিশ্বাস করিনি বলেই পোড়াইনি। কোন মুহুর্তে আপনি জানলেন আপনি পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন? উত্তর- ২৩ জুলাই ১৯৭৪। এরপর রিচার্ড নিক্সন চলে গেলেন স্মৃতি চারণায়।
এভাবে যে হবে না সে কথা বলতে পাশে এসে দাঁড়ালেন প্রযোজক জান বিরথ। বিরুদ্ধ বলছে ডেভিড ফ্রস্টকে, ডেভিড মূলতো তুমিই এই প্রোগ্রামের পরিচালক। স্মৃতিচারণ শুনে তেইশ মিনিট রেকর্ড করার কিছু নেই। তোমার উদ্দেশ্য থাকবে রিচার্ড নিক্সনকে বিব্রত করা।
তুমি তার থেকে আলাদা সত্তা হও। ক্যাসেট রোলিং হওয়ার আগে তুমি রানিং হও। প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছোঁড়। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে তুমি তাকে হারাও। তুমি ভুলেও ভুলো না এই প্রোগ্রামের তুমিই অপারেটর। অপরদিকে রিচার্ড নিক্সনের চিফ অব স্টাফের একটাই কথা, স্যার আপনি আপনার কথার লাগাম এমন টানা রাখবেন যেন ডেভিড ফ্রস্ট ঢুকতেই না পারে।
বিভ্রান্ত হলে হয় স্মৃতিচারণ নচেৎ ফরেন পলিসি নিয়ে কথা বলবেন। চীন, রাশিয়া, ভিয়েতনাম যা একটা কিছু। কিছুতেই ডেভিড ফ্রস্টের তীর আপনার দিকে তাক করতে দিবেন না। সোজা তাক করে তীর ছোড়ে ডেভিড ফ্রস্ট।
আপনি শান্তি স্থাপনের কথা বলে নির্বাচিত হয়ে এসেছিলেন হোয়াইট হাউজে অথচ ভিয়েতনামে আপনি অশান্তির আগুন জ্বেলেছেন। যারা আপনাকে নির্বাচিত করেছিল তাদের সাথে কি আপনি বিশ্বাসঘাতকতা করেননি?
উত্তর- ভিয়েতনাম যুদ্ধ আমার না। এটা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে অংশ না নিয়ে কিইবা করার ছিল। ট্রুপস তুলে নিতে চাইলেও সে পথ ছিল আরো বেশি কঠিন। ডেভিড ফ্রস্টের তীক্ষ্ণ প্রশ্ন, কম্বোডিয়ার যুদ্ধ আপনার।
সিআইএ এবং পেন্টাগনের নিষেধ সত্ত্বেও আপনি এই যুদ্ধ করলেন। প্রযোজক সাথে সাথে টিভি মনিটরে ছেড়ে দিল যেখানে কম্বোডিয়ার গণহত্যার দৃশ্য। নিক্সনের অনুভূতির ক্লোজশট রেকর্ড হচ্ছে। গণহত্যার জন্য কি আপনি দায়ী নন মি. প্রেসিডেন্ট। উত্তরে, না। আমেরিকা কখনো যুদ্ধে বেসামরিক লোক মারে না।
সেটা শত্রুদের পথ। রিচার্ড নিক্সন চূড়ান্ত বিপর্যয়ে পড়ে শেষ অংশে যখন দলিল-প্রমাণ সাপেক্ষে ডেভিড ফ্রস্ট প্রমাণ করে, ওয়াটার গেট কেলেমারির তদন্তে থাকা অফিসারদের আপনি তদন্ত বন্ধ করতে যা যা করণীয় তাই করতে বলেছিলেন।
রিচার্ড নিক্সনের মুখ দিয়ে ভুল অথবা হ্যাঁ বলার আগে রেকর্ড রুমে ঢুকে পড়ে চিহ্ন স্টাফ জ্যাক রিনান। আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন কিছুর উত্তর না দেয়ার জন্য সবিনয়ে আবেদন জানায় প্রেসিডেন্টকে মি চিফ অব স্টাফ।
ভুল বা অন্যায় স্বীকার না করে আমেরিকানদের বন্ধুদের, আমেরিকান নিয়মকে ছোট করায় যে তিনি দুঃখিত এটাই তিনি বলেন সাক্ষাৎকারের শেষ অংশে। পাশাপাশি এটাও বোঝান অনাস্থা প্রস্তাব পাশের আগেই স্বেচ্ছায় প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়াটা কি সংশোধিত হওয়ার নমুনা নয়।

পরিচালক রন হাওয়ার্ড চমৎকার একটা প্রশ্ন-উত্তর দিয়ে চলচ্চিত্র শেষ করেছেন। টিভি উপস্থাপক প্রশ্ন করছে স্বগোতক্তি ভঙ্গিমায়, এই সাক্ষাৎকারে কে বেশি লাভবান হলেন, প্রেসিডেন্ট নিক্সন না ডেভিড ফ্রস্ট। উত্তরও দিয়েছেন চমৎকার। প্রেসিডেন্ট নিক্সন নিজেকে আড়ালেই রাখলেন কিন্তু ডেভিড ফ্রস্ট এগিয়ে চলছেন সম্মুখ থেকে সম্মুখে।
ডেভিড ফ্রস্ট সম্মুখে এগিয়ে চললেও বড় যে প্রশ্ন সেটি হলো ব্রিটিশ, নাট্যকার পিটার মরগানের লেখা নাটক নিয়ে আমেরিকান পরিচালক রন হাওয়ার্ড চলচ্চিত্র ফ্রস্ট/নিক্সন নির্মাণ করতে গেলেন কেন? তাও আবার চলচ্চিত্রে মূল নাটকের নাম অক্ষুণ্ণ রেখে?
সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ন সহজ এবং স্বাভাবিক ব্যাপার। এতদসত্ত্বেও অনেকেই ভাবতে পারেন ২০০৬ সালে পরিচালক রন হাওয়ার্ডের নির্মিত চলচ্চিত্র দ্য ডা ভিঞ্চি কোডের কথা। ডান ব্রাউনের মূল উপন্যাস দ্য ডা ভিঞ্চি কোড অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র ा ডা ভিঞ্চি কোডকে মাথায় রেখে অনেকেই সিদ্ধান্তে আসতে পারেন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নির্ভর, সত্যাশ্রয়ী এবং স্বপ্নমুখর ঘটনাকে উপজীব্য করে চলচ্চিত্র নির্মাণ পরিচালক রন হাওয়ার্ডের একান্ত পছন্দ।
দা ডা ভিঞ্চি কোড যেমন যিশু খ্রিস্টের জীবনাশ্রয়ী চলচ্চিত্র তেমনি ফ্রস্ট/ নিক্সন ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বেং আমেরিকান সাইত্রিশতম প্রেসিডেন্ট রিচার্জ নিজনের জীবনাশ্রয়ী চলচ্চিত্র। আবার কেউ কেউ মনে করতে পারেন, পিটার মরগানের মঞ্চ নাটক অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করাটা এক অর্থে নাটক মঞ্চায়নের সীমাবদ্ধতাকে জেনে চলচ্চিত্র মাধ্যমের শক্তির সম্ভাবনার কাছে পরিচালক রন হাওয়ার্ডের দায়বদ্ধতা।
মঞ্চ নাটক হিসেবে ফ্রস্ট/নিজন তিনশো দর্শক থেকে শুরু করে তিন লক্ষ দর্শকের কাছে পৌঁছানো যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ এবং বহু মঞ্চায়নের মধ্য দিয়েই সম্ভব। কিন্তু সেই নাটকই যখন রুপান্তরিত হচ্ছে চলচ্চিত্রে তখন সেটি সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ দর্শকের কাছে পৌঁছে যাওয়া কয়েক সপ্তাহের ব্যাপার মাত্র।
বাস্তবিকই হয়েছেও তাই। অস্কারের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য যে কোনো দেশের চলচ্চিত্রে সে দেশেই ন্যূনতম একটা সময় প্রদর্শিত হতে হয়। ফ্রস্ট/নিক্সন আমেরিকাতেও সেভাবে প্রদর্শিত হয়েছে এবং হচ্ছে বহু সপ্তাহজুড়ে।
আবার অস্কারের প্রতিযোগিতায় পাঁচটি ক্যাটাগরিতে মনোনীত হওয়ার সুবাদে ফ্রস্ট/নিক্সন তামাম বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে চলচ্চিত্রের শক্তি যে সুদুরপ্রসারী এবং ব্যাপক, পরিচালক রন হাওয়ার্ডের সেই বিশ্বাস আবারও প্রমাণিত হয়েছে
প্রমাণিত সত্য অস্কার প্রতিযোগিতায় কমবেশি চব্বিশটি ক্যাটাগরিতে অস্কার অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। অস্কার ( OSCAR) নামের ইংরেজি বানানের অক্ষর যেমন পাঁচটি তেমনি এবারের অস্কারে ফ্রস্ট/নিক্সন চলচ্চিত্রটি মনোনীত হয়েছিল পাঁচটি ক্যাটাগরিতে।
সেরা পরিচালনার জন্য হাওয়ার্ড। সেরা এডিটিংয়ের জন্য যুগাভাবে মাইক হিল এবং ডায়েল পি হ্যানলে। সেরা সিনেমাটেআফার হিসেবে রন হাওয়ার্ড, বিয়েন ােজার এবং এরিক ফেলনার। সেরা অভিনেতা হিসেবে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চরিত্রে ফ্রাঙ্ক ল্যাংগেলা।
সেরা চিত্রনাট্যকার হিসেবে পিটার মরগান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ড্যানি বয়েলের স্লামডগ মিলিয়নেয়ার জয়জয়কারের কারণে চারটিতে পিছিয়ে পড়ে ফ্রস্ট/ নিক্সন এবং ‘মিল্ক’ চলচ্চিত্রে শন পেন-এর অভিনয়ের কাছে হেরে যায় রিচার্ড নিক্সনরূপী ফ্রাঙ্ক ল্যাংগেলা ।
ফ্রস্ট/নিক্সন চলচ্চিত্রটি যে শেষ পর্যন্ত অস্কার লাভ করতে পারলো না সেটি এ কারণে না যে চলচ্চিত্রটি মানের দিকে পিছিয়ে বরং এ কারণে যে অন্য চলচ্চিত্রটি মানের দিক দিয়ে আরো ভালো করেছে।
ভালো এবং নতুনত্বের একটি ছাপ রেখেছেন পরিচালক রন হাওয়ার্ড তার চলচ্চিত্র ফ্রস্ট/নিক্সনে। যেমন ফ্রস্ট/নিক্সন আস্ত চলচ্চিত্রটিই কাহিনীচিত্রে। কাহিনীর আদলেই চলচ্চিত্রটি ঘটনা পরম্পরা বিবৃত হচ্ছে আবার কাহিনী চলচ্চিত্রের মাঝে চরিত্ররা যেমন ডেভিড ফ্রস্ট, প্রযোজক জন বিরথ, প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ জ্যাক ব্রিনান, এক্সিকিউটিভ রিসার্চার বর জেলনিক, সহকারী রিসার্চার জেমস রেসটন প্রভৃতি চরিত্র তথ্যচিত্রের আদলে চলচ্চিত্রের মাঝেই নিজেদের যার যার ভূমিকা এবং অনুভূতির কথা বলছে যদিও সেটাও কাহিনীচিত্র। শেক্সপিয়রের নাটক হ্যামলেটের মধ্যে একটা
খণ্ডনাটকের দৃশ্য ছিল। আর রন হাওয়ার্ডের উপস্থাপনায় একটি ব্যক্তি মানুষ একটি চরিত্রে অভিনয় করছে, সেই অভিনীত চরিত্র আবার আরেকটি চরিত্র হয়ে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তার অনুভূতি প্রকাশ করছে। এককথায় নাটকের মধ্যে নাটক, সেই নাটকের মধ্যে নাটক।
পেঁয়াজের খোসা একটার পর একটা ছাড়াতে থাকলে যেমন আর অবশিষ্ট কিছুই থাকে না আবার খোসা একটার পর একটা খোসা পড়ালে পুনরায় আস্ত পেঁয়াজ তেমনি উপস্থাপনার ক্ষেত্রে রা হাওয়ার্ড তেমনই কাজটি করেছে ফ্রস্ট/নিক্সন চলচ্চিত্রে। একটু গভীরে তলিয়ে দেখলে দর্শক মাত্রই পরিচালক রন হাওয়ার্ডের এই অদ্ভুত উপস্থাপনা এবং নির্মাণ কৌশল দেখে বিস্মিত হবেন।
বিস্মিত হতে হয় পরিচাকি সত্যজিৎ রায়ের দৃষ্টিভঙ্গি দেখে। তাঁর বিশ্বাস “সিনেমা মানে আসলে এডিটিং। আমার হাতে অনেকগুলো শট আছে, কার পর কোনটাকে বসিয়ে আমি যা চাইছি, সেই জিনিসটা ফুটিয়ে তোলা যাবে, সেটাই আসলে সিনেমা।
ক্যামেরার চোখ একবার খুলে আবার বন্ধ হওয়ার মধ্যবর্তী সময়টুকুতে যা রেকর্ড হলো তাই একেকটা শট। একরম অসংখ্য শটজুড়ে ফ্রস্ট/ নিক্সন চলচ্চিত্রের শুরুতে যে ইমেজ পরিচালক রন হাওয়ার্ড দর্শকদের উপহার দিয়েছেন তার জন্য এডিটর মাইক হিল এবং ডায়েল পি হ্যানলে প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।
একদিকে টেলিভিশনে ঘোষিত হচ্ছে রিচার্ড নিক্সনের পদত্যাগের সম্ভাবনার কথা, অন্যদিকে দেখানো হচ্ছে ওয়াটার গেট বিল্ডিং, আবার অস্ট্রেলিয়ায় উপস্থাপনা করছে ডেভিড ফ্রস্ট, দেখানো হচ্ছে লন্ডনের টেলিভিশনের মূল অফিস যেখানে ডেভিড ফ্রস্ট কর্মরত, দেখানো হচ্ছে ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারির তদন্ত রিপোর্টারদের সাক্ষাৎকার, দেখানো হচ্ছে পদত্যাগের ঘোষণার আগে টিভি ক্যামেরার সামনে বসার জন্য।
রিচার্জ নিক্সনের মেকাপ নেয়া, পদত্যাগের কথা বলা, হেলিকপ্টারে চড়ে বসা, হোয়াইট হাউস ত্যাগ করা প্রভৃতি অসংখ্য শটকে যেভাবে প্রায় একই ফ্রেমে আবার জাম্প কাটের মধ্য দিয়ে সর্বোচ্চ দ্রুতগতিতে জোড়া দেয়া হয়েছে, দর্শকের চোখকে কোনো রকম ঝাঁকি না দিয়ে অর্থাৎ মসৃণ এডিটিং দর্শকদের দৃষ্টি কাড়ে। সুনিপুণ এডিটিং করার ক্ষমতা থাকলেই তবে এরকমটা সম্ভব।
সম্ভাবনার মতো জায়গা থেকে কেউ বিচারের বিবেচনায় পিছিয়ে পড়লে সত্যিই সেটা দুঃখের ব্যাপার। সেরা অভিনেতার অস্কার পুরস্কার না পাওয়াটা এক অর্থে রিচার্ড নিক্সন চরিত্ররূপী ফ্রাঙ্ক ল্যাংগেলার অভিনয় ক্ষমতার উপর নিষ্ঠুর অবিচার।
একজন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন কত সহজে সবার সাথে মিশে যেয়েও পৃথক সত্তা রাখতেন, কত জটিল এবং বিব্রতকর চাপের মুখেও মুখে মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে রাখতেন, সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার আগ্রহ কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত নিজের হাতে রাখার দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, ফণা তুলে আক্রমণ করতে আসা মিডিয়াকর্মীদের কিভাবে মুহূর্তে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করানো যায় সেরকম চাতুরী বুদ্ধি মনে পোষণ করা, স্মৃতিভ্রম ।
স্মৃতিচারণ দুটিই কিভাবে পাশাপাশি চালিয়ে চলমান থাকা যায় সেরকম শারীরিক ও মানসিক গঠন, নেশার ঘোরে টলে যেয়েও যুদ্ধ করার অঙ্গীকারে বিশ্বাস ধারণ প্রভৃতি ‘বহুমুখী বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চরিত্রে যে সাবলীল, তীক্ষ্ণ এবং মেধাসম্পন্ন অভিনয়ের মাধ্যমে ফ্রাঙ্ক ল্যাংগেলার অভিনীত চরিত্রকে দর্শকদের সামনে জীবন্ত করে তুললেন তা এককথায় অভূতপূর্ব। এরকম মাননিয়ন্ত্রিত অভিনয় অনেকদিনই দর্শকদের চোখে পড়েনি।

অস্কার জুরি বোর্ডের মাননীয় বিচারকদের নাম্বারিং স্কোরে সেরা নাম্বারটাতো ফ্রাঙ্ক ল্যাংগেলার-এর পাওয়ার কথা। না পাওয়ার কারণে ফ্রাঙ্ক ল্যাংগেলারের প্রতি যদি কোনো জুরি সদস্যর সহানুভূতি জাগে তবে সেই জুরি সদস্যের একটাই সান্ত্বনা, মাঝে মধ্যে বিচার কার্যে বিচারকদেরও ভুল হয়।
